Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

বাবাকে লেখা প্রবাসীর চিঠি

মোহাম্মদ নুরুল্লাহ, পর্তুগাল থেকে:
আমার আব্বু জয়নুল আবেদীন গত বছর ১৪ এপ্রিল দিবাগত রাতে ইন্তেকাল করেছেন। প্রবাসে থাকার কারণে আব্বুকে শেষ দেখা দেখতে পাইনি। এই ব্যথা নিয়ে প্রতিটা দিন কাটাচ্ছি। মাঝে মাঝে এমন একটা সময় সবার জীবনেই আসে যখন মানুষ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, তখন কারো পরামর্শ খুব জরুরী হয়ে পড়ে। সে সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো আদর্শ একজন মানুষ হল বাবা।

আজ আব্বুকে (১৪ই এপ্রিল দিবাগত রাত ) হারানোর এক বছর পূর্ণ হল। গত বছরের এই দিনে বাবাকে হারিয়ে চিরদিনের জন্য অনাথ হয়েছিলাম। বাবাহীন একটি ছেলের জীবন যে কতটা বিয়োগান্তক হয়, তা হয়ত যাদের বাবা বেঁচে আছে তারা কখনোই বুঝতে পারবে না। প্রতিটি মুহূর্তে মনে হয় সত্যি আমি বড়ই একা। একটু ভালবাসা দেয়ার, স্বান্তনা দিয়ে সামনে চলার প্রেরণা যোগানোর মানুষটি আজ যে বেঁচে নেই।

আব্বু নেই আজ ১ বছর, বাবাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো এ কখনো কল্পনা করিনি, কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। কেটে গেলো একেকটি দিন, মাস আর একেকটি বছর। বাবা নেই, আছে বাবার অনেকগুলো স্মৃতি, অনেকগুলো কথা, যা ভুলতে পারিনা, ভোলা যায়না। বাবাহীন প্রত্যেকদিন একেকটি ঝামেলা, একেকটি একাকীত্ব। ছায়াহীন পথ, আর লক্ষ্যহীন সকল যুক্তি। আব্বুকে খুব মিস করছি। আব্বুর জন্য অনেক কষ্ট হয়। আব্বু না থাকাটা যতটুকু কষ্টের, তার চেয়েও বেশি ঝামেলার। তুমি আমাদের সকলকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছো, তুমি বেঁচে থাকতে তোমার গুরুত্ব আমরা বুঝিনি। আজ আমরা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছি তোমার অনুপস্থিতি, তোমার চলে যাওয়া আমাদের জীবনে বিশেষ করে আমার জীবনে অপুরনীয় ক্ষতি।

আব্বু হয়তো জানো, আজকাল আমি ভীষন হিংসুটে হয়ে গেছি। অন্যদের বাবাকে দেখলে ভীষন হিংসা লাগে আমার। জানো ভীষন আব্বু বলে ডাকতে ইচ্ছে করে আমার। তোমাকে নিয়ে আগের মতো ঘুরতে ইচ্ছে করে আমার। দু’হাতে মুখ গোজে নয়, চিৎকার দিয়ে আব্বু বলে ডাকতে ইচ্ছে করে আমার। আমি অন্যদের মতো হতে চাই আব্বু । আমার আর এই যান্ত্রিক জীবন ভালো লাগেনা। তোমার ছায়ায় যতোটা দিন ছিলাম ভালোই তো ছিলাম। ছোট্ট পুচকে একটা ছানার মতো জীবনটা এগুচ্ছিল। আব্বু আমার মতো এই পুচকে ছানার ঘাড়ে এতো বড় সংসারের দায়িত্ব কিভাবে দিয়ে গেলে? আমি আজকাল বড্ড ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। জীবনের ১টা বছর তোমাকে না দেখে কাটিয়ে দিয়েছি আমি। সত্যি ভাবতে বড় অবাক লাগে। জানিনা কিভাবে সময় এতো দ্রুত ক্ষয়ে যায়।

সব কিছু যদি ক্ষনিকের জন্য উল্টো হয়ে যেতো, জানিনা হয়তো খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতাম। কি ফিরে পেতাম জানিনা, তবে তোমাতে আবারো ফিরো পেতাম ঠিকই। ফিরে পেতাম সেই সোনা ঝরা আনন্দের দিনগুলো। বুকের পাজরে আটকে রাখতাম তোমায়। যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। জানি না জীবনের খাতায় আর কিছু হারাবার আছে কি না। তবে তোমাকে হারানোর পরে মনে হয়েছিল দুনিয়াটা বড়ই নিষ্ঠুর একটা জায়গা। প্রতি শতাব্দি অন্তর অন্তর একজন মানষীর আবির্ভাব ঘটে। আমার চোখে আমার আব্বু একজন মহামনীষী। যিনি সারা জীবন কল্যান করেছেন মানুষের। লাখো মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন।

যিনি জীবনে কষ্ট করেছেন কিন্তু কখনো তার নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। স্বগৌরবে পাড়ি দিয়েছেন জীবনের ৬২টি বছর। সুখী মানুষের কাছে ৬২টি বছর হয়তো কিছুই না। কিন্তু আমার বাবা জীবনের ৬২ বছরের প্রতিটি মুহূর্ত সংগ্রামের সাথে পাড়ি দিয়েছেন। গড়ে গেছেন এক বর্নাঢ্যময় জীবনের ইতিহাস। আমার লিখনীর মাধ্যমে তার জীবনী বা তাকে সম্পুর্নভাবে ফুটিয়ে তোলার স্পর্ধা আমার নেই। কোনো কালে হবে কিনা জানিনা। বাবার বিবেক আর তার দেখানো পথে হাটছি অবিরাম। জানিনা এই পথের শেষ আছে কিনা। যদি বা শেষ না হয় এই পথের, ক্ষতি কি। জীবন তো চলবেই জীবনের মতো। ভয় কি, বাবার আর্শীবাদ আমার সঙ্গেই আছে। বাবা, তোমায় বুকে ধারন করেই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেবো। তুমি যেখানেই থাকো ভীষন ভালো থেকো। তোমার ছেলে তোমার অপেক্ষায়।

সকলের কাছে দোয়া চাই, আল্লাহ যেন আমার আব্বাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন।

লেখক প্রবাসী সাংবাদিক
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক , অল ইউরোপিয়ান বাংলা প্রেসক্লাব