Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে চলছে লাভ ক্ষতির হিসাব

আহমাদুল কবির, মালয়েশিয়া থেকে:
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে চলছে লাভ ক্ষতির হিসাব। পাশাপাশি চলছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে উত্তরণে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ আশ্বাস দিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে যেসব অনুমোদিত এজেন্ট বিদেশে কর্মী পাঠায়, শিগগিরই তাদের সবাইকে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু শ্রমিকদের আবেদনপত্র প্রক্রিয়াকরণের অনুমোদন দেয়া হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে শিগগিরই আলোচনায় বসবে মালয়েশিয়া সরকার।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী মনে করছেন, সবাইকে এই সুযোগ দেয়ার মধ্য দিয়ে এজেন্সিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থা সৃষ্টি হবে, যা কর্মীদের জন্য ইতিবাচক হবে।

খোজঁ নিয়ে জানা গেছে, ২০১২ সালে দুই দেশ শুধু সরকারি মাধ্যমে জিটুজি পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠাতে চুক্তি সই করে। ২০১৬ সালে তা পরিমার্জন করে ১০টি বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিকে জিটুজি প্লাসের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ২০১৬ সালের শেষদিক থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ শ্রমিক মালয়েশিয়া গেছেন। এরমধ্যে চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬২ জন শ্রমিক পাঠায় বাংলাদেশ।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার পার্লামেন্ট ভবনে বিদেশি কর্মীদের ব্যবস্থাপনা শীর্ষক এক বৈঠকে মাহাথির মোহাম্মদ জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। মালয়েশিয়াকে জানানো হয়েছে, মাত্র ১০টি এজেন্সি একচেটিয়া কর্মী পাঠানোর সুযোগ পায় বলে মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু বাংলাদেশি কর্মীদের জনপ্রতি ২০ হাজার মালয়েশীয় রিঙ্গিত পর্যন্ত দিতে হয় এজেন্সিগুলোকে। এ কারণেই মালয়েশিয়ার সরকার সব এজেন্ট পর্যন্ত এই সুযোগ বিস্তৃত করতে চায় যেন সেখানে প্রতিযোগিতা থাকে।

মাহাথির আরও বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশে বিদেশি কর্মীদের বিভিন্ন বিষয় দেখভালের জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করতে চান তিনি। যে দেশ থেকেই কর্মী নিয়োগ দেয়া হোক না কেন, সবাইকে ওই স্বাধীন কমিশনের একক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে চান তিনি। মাহাথির জানান, একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ওই কমিশনের নেতৃত্বে থাকবেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কর্মীদের নীতি ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখাশোনা করা হবে। শ্রমবাজার সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ও বিশ্লেষণের প্রতিও নজর রাখা হবে।

মাহাথিরের এই সিদ্ধান্তে ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশ নড়েচড়ে বসেছে। তাদের প্রশ্ন, যারা কোনও তৃতীয় পক্ষের সহযোগিতা ছাড়া সরাসরি জনশক্তি রফতানি করে তাদের কীভাবে স্বাধীন কমিশনের আওতায় আনা হবে এবং একক ব্যবস্থাপনায় তারা কীভাবে কাজ করবে?

এদিকে মালয়েশিয়া সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি (বায়রা) এবং অভিবাসন খাতের বিশেষজ্ঞরা। তবে তাদের আশঙ্কা রয়েছে নিরাপদ অভিবাসনের নিশ্চয়তা নিয়ে। মালয়েশিয়ায় অভিবাসী কর্মীরা যেন শোষণের শিকার না হয় সেদিকে দেশটির সরকারকে নজরদারি করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ১০ এজন্সির সিন্ডিকেট থেকে বেরিয়ে আসা গেলে অভিবাসন খরচ যেমন কমবে তেমনি প্রতিযোগিতামূলক একটি বাজার তৈরি হবে। তবে তারা এও বলছেন, বেশি পরিমাণে শ্রমিক পাঠানোর চেয়ে নিরাপদ অভিবাসনকে গুরুত্ব দেয়া জরুরি।

অনুন্ধানে জানা গেছে, শ্রম রফতানির ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার জিটুজি প্লাস পদ্ধতির কারণে নেপাল নড়েচড়ে বসেছে। মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি বন্ধ রেখেছে দেশটি। নেপাল সরকার বর্তমান ব্যবস্থায় মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি প্রক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে। নেপালের লেবার অ্যাটাশে সূত্রে জানা গেছে, সেদেশের সরকার মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানিতে অনেক অনিয়ম খুঁজে পায়। নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু রেখে একচেটিয়া ব্যবসা ধরে রাখতে চাচ্ছে মালয়েশিয়া। ফলে নেপাল সরকার মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি বন্ধ ঘোষণা করার পর বেকায়দায় পড়ে যায় মালয়েশিয়া সরকার।

নেপাল থেকে মূলত নিরাপত্তারক্ষীর কাজে প্রচুর লোক নিয়োগ করতো মালয়েশিয়া। জনশিক্ত নেয়া বন্ধ ঘোষণার পর দুই দফা নেপাল সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি দুই দেশ। এরপর ৩ আগস্ট মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নেপালের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কেবিনেট মিটিংয়ে আলোচনা করে। যার প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেন সব দেশ থেকে একই পদ্ধতিতে লোক নিয়োগ করা হবে। এই পদ্ধতিতে উন্মুক্ত থাকবে বাজার। শ্রম রফতানিকারক দেশের সরকারিভাবে নিবন্ধিত সব রিক্রুটিং এজেন্সি লোক পাঠানোর সুযোগ পাবে।

এর আগে অভিযোগ উঠে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি মানবপাচারচক্র মালয়েশিয়ায় শ্রমিকদের কাজ দিয়ে দুই বছরে অন্তত ২০০ কোটি মালয়েশীয় রিঙ্গিত হাতিয়ে নিয়েছে।

মালয়েশিয়ার জাতীয় দৈনিক স্টার পত্রিকার সাব এডিটর এলান পরিমলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ওই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও রয়েছে। প্রতিবেদনের পর জিটুজি প্লাসে দশ সিন্ডিকেট চক্রের কর্মী নিয়োগের চলমান প্রক্রিয়া স্থগিত ঘোষণা করে মালয়েশিয়া সরকার। ওই চক্রের বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল রাখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো বন্ধের ব্যাপারে মালয়েশিয়া সরকার কিছুই জানায়নি। আর লোক পাঠানোও বন্ধ নেই।