Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

একজন আইভী-ই আগামীর শেখ হাসিনা!

আবদুর রহিম
চতুর্দিক থেকে ইটবৃষ্টি অব্যাহত। আবার কেউ অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসছেন। তখন তিনি পদতলে। মানবপ্রাচীর তৈরী করে একজন মেয়রকে হত্যাচেষ্টা থেকে বাঁচানোর দৃশ্যর কথাই বলছি। এ যেন সেই গ্রেনেড হামলার দৃশ্য।

মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত হকারমুক্ত করা নিয়ে মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর ওপর সশস্ত্র হামলা চালান সাংসদ শামীম ওসমানের সমর্থকেরা। হামলায় আইভী এবং বহু সাংবাদিকসহ অর্ধশত ব্যক্তি আহত হন। ঘটনাস্থলে শামীম ওসমানের ক্যাডার নিয়াজুল ইসলামকেও অস্ত্র হাতে দেখা যায়।

নারায়ণগঞ্জে মেয়র আইভীকে হত্যাচেষ্টার সেই দৃশ্যে আমি মেয়র আইভীকে নয়, দেখেছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ভাবছি আগামীতে যেন একজন আইভীই হতে পারে শেখ হাসিনা! যেভাবে বুকে বুলেট নিয়ে প্রাণ প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেছেন কর্মীরা।

আমাদের সবারই জানা, গণমাধ্যমের কল্যাণে ২১ আগস্ট দেখেছিলাম মানবঢালে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কীভাবে সেদিন রক্ষা করেছিলেন। ওইদিন নেতাকর্মীরা যদি মানবঢাল তৈরী না করতো, জীবনের ঝুকি না নিতো তাহলে হয়তো আজ আমরা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে পেতাম না। আর আমরা নারায়ণগঞ্জেও দেখেছি সেই এমনি একটি দৃশ্য।

চারদিক থেকে ইটপাটকেল হচ্ছে, আর প্রকাশ্যে এক ব্যক্তি অস্ত্র নিয়ে এগিয়ে আসছেন মেয়রকে গুলি করতে। ইটপাটকেল নিক্ষেপে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যান মেয়র আইভী। তখন ২০-২৫ জন ব্যক্তি মানবঢাল তৈরী করে রক্ষা করছেন জনপ্রিয় মেয়রকে। বলতে দ্বিধা নেই গণমাধ্যমে আজ নারায়ণগঞ্জ নিয়ে যা আলোচনা হচ্ছে তার চাইতেও ভয়ানক খবর তৈরী হতে পারতো। ভাগ্য ভালো, কিছু কর্মীর রক্তের বিনিময়ে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন মেয়র।

একজন সাংসদকে নিয়ন্ত্রণ করতে বরাবরই দলীয় শীর্ষ ব্যক্তির হস্তক্ষেপ আমরা অতীতে দেখেছি। বারবার বৈঠকেও যাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। নারায়াণগঞ্জের রাজনীতিতে এতদিন শামীম ওসমান ও আইভীর বিরোধ বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এবার তা সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘদিন পর শান্ত নারায়ণগঞ্জ আবারও অশান্ত হয়ে উঠেছে।

খবরের পাতায় ও আলোচনা হচ্ছে সন্ত্রাসের এই জনপদ নিয়ে। শামীম ওসমানের রাজনীতি শুরু হয় ১৯৮১ সালে সরকারি তোলারাম কলেজের ভিপি নির্বাচিত হওয়ার মধ্যে দিয়ে। এরপর ১৯৯৬ সালে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হন এমপি হিসেবে। নারায়ণগঞ্জের টানবাজারের পতিতাপল্লী উচ্ছেদ এবং যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে নারায়ণগঞ্জে অবাঞ্চিত ঘোষণা করে তার প্রতিকী ফাঁসি দিয়ে ব্যাপক আলোচনায় চলে আসেন শামীম ওসমান। তবে বিএনপি সরকারের আমলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বেশ সমালোচিতও বটে।

অন্যদিকে সেলিনা হায়াত আইভীর বাবা আলী আহাম্মদ চুনকা যখন ১৯৮৪ সালে মারা যান আইভী তখন উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর ১৯৮৬ সালে তিনি বৃত্তি নিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ওদেসা নগরের পিরাগভ মেডিকেল ইন্সটিটিউটে পড়তে যান। পড়াশোনা শেষ করে ১৯৯২ সালে দেশে ফেরেন। আর ওই বছরই নারায়ণগঞ্জ শহর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক হন। পরবর্তী সময়ে ২০০৩ সালে তিনি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েই আওয়ামী লীগের সফল রাজনীতিতে এখনো ভূমিকা পালন করছেন তিনি।

হত্যা চেষ্টার পর বেঁচে এসে মেয়র সেলিনা হায়াত আইভী বলেছেন, আমাকে হত্যার জন্যই এ হামলা। এই হামলায় আমার বোন জামাই, ভাই, কর্মীরা হামলার শিকার হয়েছে। আমি মার খেতে প্রস্তুত ছিলাম কিন্তু কর্মীরা মার খাবে আমি কখনোই চাইনি। আমার কর্মীদের টার্গেট করে মারা হয়েছে।

আমাকে শামীম ওসমান বলতে পারতেন হকার্স মার্কেটটি ১০ তলা করা হোক, আমি সাহায্য করবো। তিনি আমাকে তা বলেননি। আমি শুধু সেদিন সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন সম্পর্কে জানাতে চেয়েছিলাম। আমি পায়ে আঘাত পেয়েছি। আমার এতোগুলো লোকজনকে অঝোরে বৃষ্টির মতো ঢিল দিলো মারলো। আপনারা দেখেছেন আমাকে কিভাবে হত্যা করতে চাইলো। আমি তো নিরস্ত্র ছিলাম আমার লোকজন তো সব নিরস্ত্র ছিল। আমি কারো সঙ্গে মারামারি বা ঝগড়া ঝাটি করতে যাই নাই। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল আমরা ফুটপাত দিয়ে হাটবো। সকলকে বলবো ফুটপাতে মানুষ হাটবে আর হকার্সরা হকার মার্কেটে যাবে এবং আমরা সেটা করতে করতেই ফুটপাত দিয়ে হেঁটে গিয়েছি এবং প্রেসক্লাবে প্রেস ব্রিফিং করে চলে আসবো।

আমি কখনো কারো সঙ্গে লাগতে যাইনি। এটা দলের হোক আর দলের বাইরেই হোক। আমার কাজ সিটি করপোরেশনের নিয়ে সারাদিন চিন্তা ভাবনা করা এবং উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা ও জনগনের সুবিধা দেয়া। এ শহরের মানুষ ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পারছে না এটা আমার জন্য বদনাম। তারা আমাকে ভোট দিয়েছে তারা এ শহর দিয়ে হাঁটতে চায়। এটাও ঠিক যে হকাররা মানবিক কারণে আসে। আমরা একবার তাদের পুর্নবাসন করেছি। এখন ঢাকা উচ্ছেদ করে দিয়েছে এ হকার যদি নারায়ণগঞ্জে এসে বসে তবে কি আমাদের বসাতে হবে বার বার।

তবে এ ঘটনার পর শামীম ওসমান বলেছেন, প্রয়োজনে দল ছেড়ে দিব। তবুও গরিব অসহায়দের জন্য আমি সব সময় কাজ করবো। যদি তাদের জন্য কাজ করতে গিয়ে আমাকে দল ছেড়ে দিতে হয় দিব। এতে কোন আপত্তি নাই। হকার আছে, থাকবে তার পরেও যদি গরীবেরা বেঁচে থাকে। আমাকে গালি দেন তবুও হকারদের জন্য কিছু করেন। আমার যা সাধ্য আমি তাই করবো। আমি এখন আল্লাহকে খুশী করতে রাজনীতি করি।

এখন বলার বিষয় হচ্ছে যেখান থেকে হকার উঠানো হচ্ছে সেটি সেলিম ওসমানের এলাকা। শামীম ওসমানের নয়! তাহলে কেন শামীম ওসমান ওখানে যাবেন? গরীবদের পাশে থেকে তিনি আল্লাহকে খুশী করার রাজনীতি করেন ভালো কথা তবে রাজনৈতিক দর্শন থেকে তার ভূমিকা পালন করতে হবে এটি দাবি রাখে। কারণ তিনি ধর্মভিত্তিক দল থেকে সাংসদ হননি। আর টাউন হল শান্ত রাখার জন্য ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে কেন সেলিম ওসমানকে না দিয়ে শামীম ওসমান দেবেন এটিও বড় সন্দেহের রাজনীতির দিক বহন করে!

গণমাধ্যমের কল্যাণে নারায়ণগঞ্জের সেই ঘটনায় দেখেছি আইভীকে বাঁচাতে মানুষ মানবঢাল তৈরী করছেন আর পুলিশ নীরব দাঁড়িয়ে থেকে পক্ষপাতিত্বের ভূমিকা পালন করছেন। এ ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ভাষ্য তারা মধ্যবর্তী অবস্থানে ছিলেন। মধ্যবর্তী অবস্থানে থেকে উভয় পক্ষকে সরিয়ে দিতে পেরেছেন।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য থাকার পরও তারা কেন নীরব ছিলেন, যথাযথ ব্যবস্থা নেননি। একজন মেয়রের মৃত্যু হলে পুলিশ প্রশাসনের নিস্তেজ ভূমিকাও এ সরকারের জন্য বড় কাটা হয়ে দাঁড়িয়ে যেত। সেদিন আমরা দেখেছি, পাশেই পুলিশ দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর সাধারণ মানুষ অস্ত্রধারী ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। সাধারণ মানুষকে কেন অস্ত্রধারী ব্যক্তিকে ধরতে হলো। যদি অস্ত্রটি লাইসেন্স করাও থাকে তাহলে উত্তেজনাস্থলে এই অস্ত্র ব্যবহার করা কতটুকু যুক্তি রাখে সেটিও স্পষ্ট বক্তব্য দিতে হবে প্রশাসনকে। আবার তার পক্ষে সাংসদ শামীম ওসমানের সাফাই শুনছি।

তার সঙ্গে আরো একটি বিষয় যোগ করছি। আমরা অতীতেও দেখেছি রাজনৈতিক সংঘর্ষে সব সময় সাংবাদিকদের টার্গেট করা হয়। নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন সবুজ, বৈশাখী টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি রফিকুল ইসলাম রফিক, যমুনা টেলিভিশনের স্টাফ করেসপনডেন্ট আমির হুসাইন স্মিথ, ইনডিপেনডেন্টের জেলা প্রতিনিধি মজিবুল হক পলাশ, আরটিভির মো. শফিকুল ইসলামসহ ১০/১২ জন সাংবাদিককে রক্তাত্ব হতে হয়েছে।

এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেছেন, দেখুন, একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। এ জন্য যা দরকার সেটা আমরা করছি। যারা অস্ত্র দেখিয়েছে, যারা নিজের হাতে আইন তুলে নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবশ্যই নেয়া হবে। আমরা খতিয়ে দেখছি। ভিডিও ফুটেজ দেখে কারা করেছে তাদের ধরার জন্য প্রচেষ্টা নিচ্ছি এবং কি কারণে করল, তার পুরোপুরি একটা ইনকোয়ারি আমরা করছি।

তিনি আরো বলেন, আমরা এটুকু অ্যাসিওরেন্স দিচ্ছি, আমরা কাউকে ছাড়ব না। যেই আইন ভঙ্গ করবে তার ব্যবস্থা অবশ্যই হবে। যারা অস্ত্র দেখিয়েছে, যারা নিজের হাতে আইন তুলে নিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিষয়ে দলের শীর্ষ ব্যক্তি ও তাদের তলব করেছেন। সুষ্ঠ তদন্ত ও সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে জনগনের অধিকার এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বর সুন্দর ধারা অব্যাহত থাকবে আমরা দৃঢ বিশ্বাস রাখি।

লেখক: সাংবাদিক

পাঠকের মতামতের লেখার দায়বদ্ধতা শুধুমাত্র লেখকের। এর সঙ্গে সিএসবি নিউজ ২৪ ডটকমের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই।