Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশির অভিনব সাফল্য

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশির অভিনব সাফল্য, পর্ব-০১

আহমাদুল কবির মালয়েশিয়া থেকে
অজপাড়া গাঁয়ের যে ছেলেটি ভাগ্য অন্বেষণের লক্ষ্যে বৈধ বা অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় এসেছিল আজ সেই ছেলেটি মালয়েশিয়ায় একজন সফল বাংলাদেশি। পর্যটন নগরি মালয়েশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে আজ এমন হাজার হাজার বাংলাদেশি রয়েছেন যাদের প্রথম পর্বের ইতিহাস খুবই কষ্ট অপমান বিজড়িত স্মৃতি। মালয়েশিয়ায় যাওয়া যে ছেলেটি ভাষা না জানার কারণে মালিকের বকাঝকা, থাপ্পর খেয়েছেন সে আজ অনর্গল মালয় ভাষা বলতে পারে। যে ছেলেটি দিন রাত প্লান্টেশনে বা কন্সট্রাকশনে কাজ করে হাত লোহা করে ফেলেছেন। আজ তিনি হয়তো একটি মিনি মার্কেট বা রেষ্টুরেন্ট অথবা একটি ট্রাভেল এজেন্সির মালিক। তার প্রতিষ্ঠানেই হয়তো ১০/১২ জন মালয়েশিয়ান লোক চাকুরী করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

যে ছেলেটি ঠিক মতো বাস ভাড়া দিতে পারেনি একদিন। সে আজ আধুনিক মডেলের দামী গাড়ী চালাচ্ছে। ওই সব বাংলাদেশিরা নিঃসন্দেহে সবুজ বাংলার গর্ব। প্রবাসীদের গর্ব। মালয়েশিয়ায় আজ চাকুরী পেয়ে বা না পেয়ে যে সব প্রবাসী বাংলাদেশিরা চরম হতাশায় রয়েছেন তাদের জন্যও প্রেরণার উৎস এসকল সফল বাংলাদেশি। সফল বাংলাদেশিদের চলার ইতিহাস জেনে অনেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভাবেন আমি কেনো পারবনা। আজ যারা সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করছেন তাদের অনেকেই অতীত দুঃসহ যন্ত্রণা আর কষ্টে কেটেছে সে দেশে। আজকের অবস্থানে আসতে তাকে হয়তো বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।

কিন্তু মেধা, শ্রম ও কর্ম নিষ্ঠার গুনে যারা সাফল্যের চূড়ায় উঠতে পেরেছেন তারা প্রমাণ রেখেছেন যে আমরা পারি এবং পারব। রাজধানী কুয়ালালামপুর বা আশপাশের শহরগুলোতে চোখে পড়ে বাংলাদেশী বহু প্রতিষ্ঠান। যারা তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন প্রবাসে স্বপ্নের পৃথিবী। প্রকৃত অর্থে তাদের জন্যই স্বার্থক এ পরবাস। স্বপ্নের দেশে সময় ধৈর্য্য ধরে স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে তারা চলেছেন সঠিক পথে। শুধু তাই নয় গর্বের বিষয় যে, মালয়েশিয়ায় মাল্টিমিডিয়া কোম্পানী, বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান বা বিভিন্ন ব্যাংক বীমা প্রতিষ্ঠানে বহু বাংলাদেশি চাকুরী করছেন ঈর্ষনীয় পদে। যশ সম্মান, খ্যাতি ছড়িয়ে তারা উজ্জল করেছেন বাংলাদেশের ভাবমূর্তি।

শুধু শ্রমজীবী প্রবাসীই নন বাংলাদেশের ছাত্ররাও তাদের স্ব কর্মে প্রতিভায় অধিষ্ঠিত আছেন বিশাল দায়িত্বে। এমনকি মালয়েশিয়ার বহু উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডে নীতি নির্ধারকের ভূমিকাও পালন করছেন বাংলাদেশীরা। বহু জাতিক দেশ মালয়েশিয়ায় বিশ্বের যে কোন মানুষ তার মেধা ও কর্মে সাফল্য অর্জনের সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। তাদেরই একজন শরীয়তপুরের অজপাড়া গায়ের ছেলে মো: নীরব হোসেন।

নিরব তার একক যোগ্যতায় এক বৃটিশ বন্ধুর অনুপ্রেরণায় মালয়েশিয়ার মাটিতে কৃষি কাজ করে সাফল্য অর্জন করেছেন। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের উচু পাহাড় ঘেরা গেন্তিং হাইল্যান্ড এলাকায় সবজি ফার্ম করে তিনি এখন স্বাবলম্বী।

বুধবার এ প্রতিবেদকে সঙ্গে সরেজমিন কথা হয় নিরবের, তিনি জানান মালয়েশিয়া জীবনে তার অভূতপূর্ব সাফল্যের কথা।

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ থানার মনুয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী আব্দুল আজিজের একমাত্র ছেলে মো. নীরব হোসেন। ২০০১ সালে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে পাড়ি জমান স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায়। হোটেল ম্যানেজমেন্টে শুরু করেন পড়াশোনা। এর পাশাপাশি একটি রেস্টুরেন্টে পার্টটাইমের চাকুরি শুরু করেন। চাকুরির সুবাদে পরিচয় হয় বৃটিশ নাগরিক অ্যালেস্টারের সঙ্গে। দুইজনই একটি থ্রি-স্টার রেস্টুরেন্টে চাকুরি করতেন।

নীরবের ইচ্ছা ছিল মালয়েশিয়া থেকে পড়াশোনা শেষ করে ইউরোপের ভালো কোনো দেশে পাড়ি জমানো। কিন্তু বৃটিশ নাগরিকের পরামর্শে থেকে যান মালয়েশিয়ায়। তিনিই মূলত নীরব হোসেনকে পরামর্শ দেন মালয়েশিয়াতে শব্জি ফার্ম করার। সেই থেকে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন নীরব।

এদিকে, কলেজে পড়াকালিন সময়ে পরিচয় হয় মালয়েশিয়ার পাহাং রাজ্যের রয়েল পরিবারের তরুনি ফাতেমা বিনতে ইসমাইলের সঙ্গে। একদিন ক্লাস শেষে ফাতেমার কাছে তার স্বপ্নের কথা বলতেই ফাতেমা তাকে গ্যান্টিং হ্যায়ল্যান্ডে তাদের নিজেদের জমির কথা বলেন এবং তার পিতা মোহাম্মদ ইসমাইল উদ্দীনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।

মালয়েশিয়াতে ব্যবসা শুরু করতে লোকাল লোকের প্রয়োজন। যার নামে থাকবে অফিসিয়াল কাগজপত্র। আর এই দিক থেকে সকল সহযোগিতা করেন ইসমাইল উদ্দিন। আকার হাসিল এসডি এন. বিএইসডি নামক কোম্পানির তত্ত্বাবধানে সালাদ (সবজি) ফার্মের নাম দেন গেন্টিং গ্রীন গার্ডেন।

রাজধানি কুয়ালালামপুর শহর থেকে ৪৭ কিলোমিটার দূরে মাটি থেকে ৮৫০ মিটার উপরে পাহাড়ের উপর গেন্টিং নামক স্থানে ১০ একর জমি থাকলেও ৫ একর জমির মধ্যে স্থাপন করেন সবজি বাগান। বাগানে উৎপাদিত হয় বিশ্বমানের কয়েক প্রকার সালাদ পাতা যার মধ্যে লেটুস পাতা, লোল্লো বিয়ানদো, রেডিসচিও, ওয়াটারক্রেস,বাটার লেটুস, রকেট/আরুগুলা, রেড ওরাস, গ্রীন রোমাইন, ড্যান্ডেলিয়নের মত সালাদ পাতা। এখানকার উৎপাদিত সালাদ মালয়েশিয়ার ফাইভস্টার হোটেল, কেএফসি, ম্যাকডোনালস, নান্দুস, স্টারহাবের মত বড় বড় সুপারশপ প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সিংগাপুর এবং দুবাইতে রপ্তানি করা হয়।

ফার্মে ব্যবহারিত সকল প্রকার বিজ থেকে শুরু করে ইকুয়েপমেন্ট সবই জার্মান থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে। পাশাপাশি ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়।

নীরব হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন, বর্তমানে তার ফার্মে ৭জন বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করে থাকেন। তারাই মূলত ফার্মটির দেখভাল করে থাকেন। ময়মনসিংহ এর ফয়েজ দুই বছর ধরে ফার্মে কাজ করছেন। ফয়েজ বলেন, মালয়েশিয়ার মাটিতে বাংলাদেশি মালিকানায় এ বাগানে কাজ করে ভাল লাগছে। মনে হচ্ছে দেশেই আমি কাজ করছি। মাস পরে বেতন পাচ্ছি। তবুও নিজের বাগান মনে করে শ্রম দিচ্ছি।

নিরব বলেন, আমি যখন অন্যান্য দেশে ব্যবসার জন্য যাই তখন তারা নিজ দায়িত্বে ফার্মটি দেখাশুনা করেন। ইতোমধ্যে তিনি জার্মান, ইতালি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, জাপান, ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবসায়িক সফর করেছেন। যার মধ্যে নেদারল্যান্ডের এনজা কোম্পানি, টোকিওর সাকাতা ও জার্মানির বায়ার নামক ৩টি নাম করা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ শুরু করেছেন। আগামী জুন মাসে তিনি নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দেবেন। সেখানে তিনি নিজস্ব সালাদ ফার্মের ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছেন।

এদিকে নীরব হোসেন ওয়ার্ল্ড তাইকোন্ড ফেডারেশন দক্ষিণ কোরিয়া মার্শাল আর্টে ব্লাকবেল্ট প্রাপ্ত। তিনি রোটিরি ক্লাবের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। সফল এ ব্যবসায়ী নিজেকে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি কৃষক বলতে গর্ববোধ করেন।

উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ায় কয়েক পর্বে বাংলাদেশীদের আগমন ঘটে। ব্রিটিশ শাসনামলে অনেক বাংলাদেশী পেশাজীবি এদেশে আসেন। তারপর স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে সত্তর দশকে কিছু বাংলাদেশী কৃষিকাজে মালয়েশিয়ায় যান। আশির দশকে অনেক ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার, ছাত্র আসতে থাকেন, নব্বই দশক থেকেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সে দেশের প্রশাসনিক কাজে যোগ দেন শত শত বাংলাদেশী। এদের মধ্য থেকে অনেকে আজ সফল বাংলাদেশি হিসেবে সে দেশে সম্মানের সহিত মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন। এমনকি অনেকে মালয়েশিয়ায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সাফল্যের স্বর্গ ছুঁতে চলেছেন।

মালয়েশিয়ায় হাজব্যান্ড অব সিটিজেন হয়ে তা সরকার প্রদত্ত সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে সাফল্যের পথকে কুসুমাস্তিন করেছেন। তবে দুঃখজনক যে, এসব বাংলাদেশীরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করলেও অনৈক্য বিভেদ ও ব্যর্থতার কারণে মালয়েশিয়া সমাজ ব্যবস্থা খুব বেশি আলোকিত হতে পারছেন না। যোগ্যতা অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও একলা চলো নীতি অবলম্বন করে অনেকে আত্মমুখী হয়ে পড়েছেন। ঐক্যের অভাবে আজ বিপদগ্রস্থ বাংলাদেশীদের গোষ্ঠীগত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে অনেকে দেশের দুর্যোগে বা বিপদগ্রস্থ বাংলাদেশীদের কল্যাণে ব্যক্তিগত সাহায্য সহযোগিতার হাত প্রসার করেছেন। সকল ভেদাভেদ ভুলে প্রবাসে সকল ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে দেশ ও দশের কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা আশা প্রকাশ করেন।