Templates by BIGtheme NET
ব্রেকিং নিউজ :

স্মৃতিতে নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়

মোহাম্মদ নুরুল্লাহ:
জীবন সে তো পদ্ম পাতার শিশির বিন্দু। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে একটু একটু করে প্রখর হওয়া ভোরের প্রথম আলোকরশ্মি কিংবা শীতের রাতে টিনের চালের টুপ-টাপ শব্দ– এইতো জীবন। স্বল্পায়ত, কিন্তু বড্ড বেশিই বৈচিত্র্যময়। বিয়ের আসরে সদ্য পা রাখা নববধুটির মত ‘জীবনটাকেও সাজানোর জন্য কত প্রয়াস, কত ব্যস্ততা। এর মাঝেও ফেলে আসা মুহূর্তগুলোর জন্য একবার হলেও সবাই পিছনে তাকায় আর অবাক হয়ে আবিষ্কার করে স্মৃতির অ্যালবাম সাজিয়ে বসে থাকা সুবিন্যস্ত অপেক্ষমান স্মৃতিগুলোকে।

স্কুল জীবনের স্মৃতি আমার স্মৃতিগুলো অতীতকে জীবন্ত করে বর্তমানকে ভুলিয়ে দিতে চায়। ভালো লাগে অতীতের স্মৃতিচারণ করতে। স্মৃতির যে অধ্যায়টি আমার কাছে সবচেয়ে সুখের তা হলো আমার স্কুল জীবন আর শৈশব। আমি পড়তাম চট্টগ্রামের নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ে। স্কুলের গল্প করতে গেলে বন্ধুদের কথা আগে বলা দরকার। বন্ধু ছাড়া স্কুল আর শৈশব আমি চিন্তা করতে পারি না বন্ধুগুলোকে আমার অস্তিত্ব মনে হতো। কে বেশি কাছের তা আলাদা করা কঠিন। অনুভবের অনুরণনে আজও ভাস্বর হয়ে আছে স্কুলের স্মৃতি। স্কুলটি যেমন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় অনন্য তেমনি স্কুলের মাঠটিও ইতিহাসের অনন্য সাক্ষী। আমাদের এই মাঠ থেকেই ওঠে এসেছেন দেশ সেরা ফুটল খেলোয়াড় যাঁরা বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং এখনো অনেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মনে পড়ে স্কুল জীবনের সেই দুরন্তপনা, বন্ধুদের সঙ্গে হৈ হুল্লোড় আর ছুটিয়ে আড্ডা দেয়া, একসঙ্গে টিফিন খাওয়া, কখনো কখনো স্কুল ফাঁকি দেয়া ইত্যাদি।

এখনো মনে পড়ে হোম টাস্ক যেদিন রেডি না করে ক্লাসে আসতাম সেদিন ক্লাসে স্যারের কাছে থেকে মুখ লুকানো কথা। মনে পড়ে প্রাণপ্রিয় শিক্ষক মহোদয়গণের কথা যাদের আবার বেশ কয়েকজন এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। কৈশোরের ফেলে আসা স্কুল জীবনটা যদি আবার ফিরে পেতাম! যদি আবার মিশে যেতো পারতাম একে অপরের সঙ্গে আনন্দে ও নিষ্পাপ ভালবাসায়। জানি যা চলে গেছে তা আর ফিরে আসবে না তবু প্রিয় স্কুলের স্মৃতি এখনও ধরা দেয় এক নির্মল আনন্দের প্রতিচ্ছবি হয়ে। তাইতো খুঁজে ফিরি স্কুল বন্ধুদের চেনা মুখ, কারো পানে তাকিয়ে দেখা আঁড় চোখ, দুষ্টু কোন খুনশুটি। কৈশোরিক উন্মাদনায় এখনও খুঁজি স্মৃতির ডায়েরীতে অম্লান স্কুল জীবনের সময়গুলি। কৈশেরের দুরন্তপনা পেরিয়ে আজ দায়িত্বশীল কর্মজীবনে দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে অনুভূতিগুলো শুকনো হয়ে গেলেও ছুটিতে যখন দেশে যায় স্কুল প্রাঙ্গনে গিয়ে স্মৃতিচারণে সাঁতরে বেড়ায়। ফলাফলের ধারাবাহিকতায় কখনো কখনো ছন্দপতন হলেও উত্তর চট্টগ্রামে এখানে আমাদের স্কুলটি সব মিলিয়ে অনন্য।

শত বছরের ইতিহাসে এই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের সফলতা ও কার্যক্রমের ব্যপ্তি এত ব্যাপক যে তা উল্লেখ করে শেষ করার মতো নয়। দেশের সচিব, আমলা, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে সর্ব পর্যায়ে এই স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের পদচারণা রয়েছে প্রশংসনীয় পর্যায়ে। ঐতিহ্যের পতাকা ধরে ৫০ বছর অতিক্রম করা নাসিরাবাদ হাই স্কুলকে অনুভব করি হৃদস্পন্দনের মতো। সৃষ্টিতে স্কুলটি তার স্বকীয়তা বজায় রাখবে আর সমাজকে উপহার দেবে দেশ সেরা সন্তান যাদের জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হবে সমগ্র দেশ আর উপকৃত হবে পুরো জাতি। সফলতার স্বর্ণমুকুট সব সময় যেন আমার প্রাণপ্রিয় স্কুলটি নিজের করে ধরে রাখতে পারে সেই প্রত্যাশায় আগামীর পথে চেয়ে আছি।

স্কুল, বন্ধু, শৈশব সবকিছুই আবার ফিরে পেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। সময়ের স্রোত অতীত ফিরিয়ে দেয় না। তাই স্মৃতি হাতড়ে বেঁচে থাকতে হয় জীবনভর। এখন বার বার রবীন্দ্রনাথের গানের একটি কলি মনে পড়ে, “জীবন যখন ফুরিয়ে যায় করুণা ধারায় এস।”

লেখক: পর্তুগাল প্রবাসী
সাংবাদিক ও প্রাক্তন ছাত্র