Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসরা ও মিরাজ (১)

আতহার আলী: إن الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وعلى آله وصحبه أجمعين أما بعد আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে নবী ও রাসূল প্রেরণ করেছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা নবী ও রাসুলদের মধ্যে মর্যাদার তারতম্য করেছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِنْهُمْ مَنْ كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ
অর্থ: ঐ রাসূলগণ, আমি তাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, তাদের মধ্যে কারো সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেছেন এবং কারো কারো মর্যাদা উঁচু করেছেন। [সূরা আল বাকারাহ:২৫৩] আর আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সকল নবীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তার মর্যাদার স্থানকে উচ্চকিত করেছেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
অর্থ: ঐ রাসূলগণ, আমি তাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি, তাদের মধ্যে কারো সঙ্গে আল্লাহ কথা বলেছেন এবং কারো কারো মর্যাদা উঁচু করেছেন। [সূরা আল বাকারাহ:২৫৩]। আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আামাকে সকল নবীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে’ [সহীহ মুসলিম:১১৯৫]। আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনেক মুজিযা দান করেছেন, যার মাধ্যমে তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। ইসরা ও মিরাজ সেসব মুজিযার মধ্যে অন্যতম। আমরা আলোচ্য প্রবন্ধে ইসরা ও মিরাজ নিয়ে আলোকপাত করার প্রয়াস পাবো।

ইসরা ও মিরাজ কী
ইসরা অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ। ‘ইসরা’ বা রাত্রিকালীন ভ্রমণ বলতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত সফরকে বুঝানো হয়। মিরাজ শব্দের অর্থ উর্ধগমন। আর যমীন হতে ঊর্ধ্বলোকে ভ্রমণকে মিরাজ বলা হয়। আল্লাহ তার প্রিয়তম বান্দা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কাছে নিয়ে বিশ্বমানবতার জন্য বিশেষ দিক-নির্দেশনার জন্য নবুয়াতের ১০ম বছরের কোন এক রাতে আকাশে ডেকে নেন, ইসলামের ইতিহাসে এটাকে ইসরা ও মিরাজ নামে অভিহিত করা হয়। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
অর্থ: পবিত্র মহান সে সত্বা, যিনি তার বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন আল মাসজিদুল হারাম থেকে আল মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। [ সূরা ইসরা:১]

ইসরা ও মিরাজের সময়কাল
ইসরা ও মিরাজ কখন হয়েছিল সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন দলিল পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে নিম্নে কয়েকটি মতামত উপস্থাপন করা হল:
ক. ইমাম ইবনুল কাইয়ুমের মতে ,
عرج برسول الله – صلى الله عليه وآله وسلم – إلى بيت المقدس والى السماء قبل خروجه إلى المدينة بسنة . “মদিনায় হিজরাতের ১বছর পূর্বে মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল”

খ. তাবারীর মতে,
كان الاسراء في السنة التي اكرمه الله فيها بالنبوة
“যে বছর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবুওয়াত দ্বারা সম্মানিত করা হয়েছিল, সে বছর মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল”

গ. ইমাম নববী ও কুরতুবীর মতে,
كان بعد المبعث بخمس سنين
“নবুওয়াতের ৫ম বছর মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল”

ঘ. আল্লামা মানসুরপুরীর মতে,
كان ليلة السابع والعشرين من شهر رجب سنة ১০ من النبوة
“নবুওয়াতের ১০ম বছর ২৭ রজবে মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল”

ঙ. ইবনু আবদুল বারের মতে,
كان بين الإسراء والهجرة سنة وشهران
“হিজরাতের ১বছর ২মাস পূর্বে মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল”

চ. নাজরাতুন নাঈম গ্রন্থের মতে ,
وقع ذلك في السنة العاشرة من المبعث، بعد وفاة عمه أبي طالب
“নবুওয়াতের ১০ম বছর আবু তালিবের মৃত্যুর পরে মিরাজের ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল”

মিরাজের প্রেক্ষাপট
যুগে যুগে প্রত্যেক নবী ও রাসুল দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী এবং তার সাহাবীগণের বেলাও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا حَسْرَةً عَلَى الْعِبَادِ مَا يَأْتِيهِمْ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ

অর্থ:“আফসোস, বান্দাদের জন্য! যখনই তাদের কাছে কোন রাসূল এসেছে তখনই তারা তাকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করেছে” [সূরা ইয়াছিন: ৩০]। প্রকাশ্যে দাওয়াত ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাহাবীদের উপর যুলুম-নির্যাতন নেমে আসে। মাক্কী জীবনের শেষের দিকে মুহাম্মদ সা. এবং তার সঙ্গী-সাথীগণ গিরি দূর্গ থেকে কেবল বেরিয়ে এসেছেন এবং কুরাইশদের জুলুম-নিপীড়ন থেকে সাময়িকভাবে কিছুটা হলেও মুক্তি পেয়েছেন।

এ অবস্থায় কিছুদিন পরই বিদায় নিলেন চাচা আবু তালিব। যিনি আমাদের নবীকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। এতে করে কুরাইশরা আবার মারমুখী হয়ে উঠল। শুরু করল নানা ধরনের নির্যাতন আর নিপীড়ন, চাচা আবু তালিবের জীবদ্দশায় যা তারা সাহসও করতে পারেনি। চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর পর রাসূলের প্রিয়তমা স্ত্রী যাকে আল্লাহ তায়ালা সালাম জানিয়েছিলেন হযরত খাদীজাতুল কুবরাও (রা.) মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো চিন্তিত হয়ে পড়লেন। যতই দিন যেতে লাগল ততই অবস্থা কঠিন থেকে কঠিনতর হতে লাগল। এজন্য এ বছরকে ‘শোকের বছর’ বলা হয়ে থাকে।

নতুন কোন লোকই আর ইসলামী দাওয়াত কবুল করেছিলো না। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদ্ধান্ত নেন, তায়েফ গিয়ে ইসলাম প্রচার করতে হবে। তায়েফে তখন অনেক ধনী ও প্রভাবশালী লোক বাস করতো। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানান। এই সব প্রভাবশালী ব্যক্তি তার কথায় কান দিলো না। কেউ কেউ তাকে খুব বিদ্রূপ করে। তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিছনে শহরের বখাটেদের লেলিয়ে দেয়। বখাটের দল নবীর পিছু নেয় ও তার প্রতি পাথরের টুকরা নিক্ষেপ করতে থাকে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেল। এমতাবস্থায় তিনি দুআ করলেন,

للَّهُمَّ إلَيْك أَشْكُو ضَعْفَ قُوَّتِي وَقِلَّةَ حِيلَتِي وَهَوَانِي عَلَى النَّاسِ أَنْتَ رَبُّ الْمُسْتَضْعَفِينَ وَأَنْتَ رَبِّي اللَّهُمَّ إلَى مَنْ تَكِلُنِي ؟ إلَى بَعِيدٍ يَتَجَهَّمُنِي ؟ أَمْ إلَى عَدُوٍّ مَلَّكْته أَمْرِي ؟ إنْ لَمْ يَكُنْ بِك غَضَبٌ عَلَيَّ فَلَا أُبَالِي غَيْرَ أَنَّ عَافِيَتَك هِيَ أَوْسَعُ لِي. أَعُوذُ بِنُورِ وَجْهِك الَّذِي أَشْرَقَتْ لَهُ الظُّلُمَاتُ وَصَلُحَ عَلَيْهِ أَمْرُ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ أَنْ يَنْزِلَ بِي سَخَطُك أَوْ يَحِلَّ عَلَيَّ غَضَبُك لَك الْعُتْبَى حَتَّى تَرْضَى

একদিকে চাচা আবু তালিব ও স্ত্রী খাদীজাতুল কুবরা (রা.) এর ইন্তেকাল, অপরদিকে চতুর্দিক থেকে নির্যাতন, নিপীড়ন, নিষ্পেষণ এবং অত্যাচারের মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছিল। ঠিক তেমনি মুহূর্তে আল্লাহ তার প্রিয় বান্দাকে নিজের কাছে ডাকলেন এবং নির্দেশনা প্রদান করলেন। মিরাজ একটি বাস্তব ঘটনা। কোন কাহিনি বা গল্প নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার এক বিশেষ অনুগ্রহ আমাদের প্রিয় নবীর উপর।

মিরাজের উদ্দেশ্য
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াতী জীবনে ইসরা ও মি‘রাজের মত এক মহিমান্বিত ও অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পেছনে উদ্দেশ্যসমূহ হল-

ক. মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে হাজির হওয়া। চারিদিকে নির্যাতন, চাচা আবু তালিব ও বিবি খাদিজার ইন্তেকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চিন্তিত করে ফেলেছিল। সেজন্য আল্লাহ তাআলা তাকে ডাকলেন। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে,
إِنَّا لَنَنْصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ يَقُومُ الْأَشْهَادُ

অর্থ: নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে ও মুমিনদেরকে দুনিয়ার জীবনে এবং যেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে সেদিন সাহায্য করব। [সূরা মুমিন:৫১]

খ. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশেষ মর্যাদা দেয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশেষ মর্যাদা দেয়ার জন্য ইসরা ও মি‘রাজ সংঘটিত হয়েছে। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে,
وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ
অর্থ: আর আমি তোমার (মর্যাদার) জন্য তোমার স্মরণকে সমুন্নত করেছি। [সূরা ইনশিরাহ:৪]

গ.ঊর্ধ্বলোক সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন ও পরিভ্রমণ করা, আল্লাহর নিদর্শনাবলী দেখা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى
অর্থ: নিশ্চয় সে তার রবের বড় বড় নিদর্শনসমূহ থেকে দেখেছে। [সূরা আন নাজম: ১৮]

ঘ.স্বচক্ষে জান্নাত-জাহান্নাম অবলোকন। আল্লাহ তা‘আলা ইমানদার বান্দার জন্য জান্নাত আর কাফিরের জন্য জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তার রাসুলকে জান্নাত-জাহান্নাম দেখানোর মাধ্যমে উম্মত যেন সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
وَأَنْزَلَ اللهُ عَلَيْكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُنْ تَعْلَمُ وَكَانَ فَضْلُ اللهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا
অর্থ: আর আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমাত এবং তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা তুমি জানতে না। আর তোমার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে মহান। [ সূরা নিসা: ১১৩]

ঙ. সকল নবীর মিশন এক । সেজন্য পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও পরিচিত হওয়া মিরাজের অন্যতম উদ্দেশ্য। আল্লাহ তা’আলা বলেন :
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
আর তোমার পূর্বে এমন কোন রাসূল আমি পাঠাইনি যার প্রতি আমি এই ওহী নাজিল করিনি যে, ‘আমি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই; সুতরাং তোমরা আমার ইবাদাত কর।’ [সূরা আম্বিয়া: ২৫]

চ.কারা ঈমানদার ও কারা বেঈমান বা দুর্বল ইমানের অধিকারী সেটা পরিষ্কার হয়ে যাওয়া। মহান আল্লাহ বলেন,
وَمَا جَعَلْنَا الرُّؤْيَا الَّتِي أَرَيْنَاكَ إِلَّا فِتْنَةً لِلنَّاسِ وَالشَّجَرَةَ الْمَلْعُونَةَ فِي الْقُرْآنِ
অর্থ: আর যে ‘দৃশ্য’আমি তোমাকে দেখিয়েছি তা এবং কুরআনে বর্ণিত অভিশপ্ত বৃক্ষ কেবল মানুষের পরীক্ষাস্বরূপ নির্ধারণ করেছি’ [ সূরা ইসরা: ৬০]

মিরাজের বিবরণ
মিরাজের ঘটনা সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণনা করা হয়েছে, একদিন সকাল বেলা হযরত মুহাম্মদ সা. প্রকাশ করেন, ‘গত রাতে আমার প্রভু আমায় অত্যন্ত সম্মানিত করেন। আমি শুয়ে বিশ্রাম করছিলাম, এমন সময় জিবরাঈল এসে আমাকে জাগিয়ে কা’বা মসজিদে নিয়ে যান। সেখানে তিনি আমার বক্ষ বিদীর্ণ করেন এবং তা জমজমের (কা’বার মধ্যকার পবিত্র কুয়া) পানি দ্বারা ধুয়ে ফেলেন। অতঃপর তাকে ঈমান ও হিকমত দ্বারা পূর্ণ করে বিদীর্ণ স্থান পূর্বের ন্যায় জুড়ে দেন। এরপর তিনি আমার আরোহণের জন্যে খচ্চরের চেয়ে কিছু ছোট একটি সাদা জানোয়ার উপস্থিত করেন। তার নাম ছিলো বুরাক। এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন জানোয়ার ছিলো। আমি তার ওপর আরোহণ করতেই বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়ে উপনীত হলাম। এখানে বুরাকটি মসজিদে আকসার দরজার সঙ্গে বেঁধে রেখে আমি মসজিদের মধ্যে প্রবেশ করে দু’রাকা’আত নামায পড়লাম। এই সময় জিবরাঈল আমার সামনে দুটি পেয়ালা উপস্থিত করলেন। তার একটিতে শরাব এবং অপরটিতে ছিলো দুধ। আমি দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করে শরাবেরটি ফেরত দিলাম। এটা দেখে জিবরাঈল বললেন, ‘আপনি দুধের পেয়ালাটি গ্রহণ করে স্বভাব-ধর্মকেই (দ্বীনে ফিত্রাত) অবলম্বন করেছেন।’

এরপর মহাকাশ ভ্রমণ শুরু হলো। আমরা যখন প্রথম আকাশ (পৃথিবীর নিকটতম আকাশ) পর্যন্ত পৌঁছলাম, তখন জিবরাঈল পাহারাদার ফেরেশতাকে দরজা খুলে দিতে বললেন। সে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার সঙ্গে কে আছেন?’ জিবরাঈল বললেন, ‘মুহাম্মদ’। ফেরেশতা আবার জিজ্ঞেস করলো, এঁকে কি ডাকা হয়েছে? জিবরাঈল বললেন, ‘হ্যাঁ ডাকা হয়েছে। একথা শুনে ফেরেশতা দরজা খুলতে খুলতে বললো, ‘এমন ব্যক্তিত্বের আগমন মুবারক হোক।’ আমরা ভেতরে ঢুকতেই হযরত আদম আ. এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। জিবরাঈল আমায় বললেন, ‘ইনি আপনার পিতা (মানব বংশের আদি পুরুষ) আদম। আপনি এঁকে সালাম করুন। আমি সালাম করলাম। তিনি সালামের জবাবদান প্রসঙ্গে বললেন, ‘খোশ আমদেদ! হে নেক পুত্র, হে সত্য নবী’।

এরপর আমরা দ্বিতীয় আকাশে পৌঁছলাম এবং প্রথম আকাশের ন্যায় সওয়াল-জবাবের পর দরজা খুলে দেয়া হলো। আমরা ভেতরে গেলাম এবং হযরত ইয়াহ্ইয়া ও হযরত ঈসা আ. এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। জিবরাঈল তাঁদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনি সালাম করুন।’ আমি সালাম করলাম। উভয়ে জবাবদান প্রসঙ্গে বললেন, ‘খোশ আমদেদ! হে নেক ভ্রাতা, হে সত্য নবী!’ অতঃপর আমরা তৃতীয় আকাশে পৌঁছলাম। এখানে হযরত ইউসুফ আ. এর সঙ্গে দেখা হলো। আগের মতোই তার সঙ্গে সালাম-কালাম হলো। অনুরূপভাবে চতুর্থ আকাশে হযরত ইদরীস আ. এর সঙ্গে, পঞ্চম আকাশে হযরত হারুন আ. এর সঙ্গে এবং ষষ্ঠ আকাশে মূসা আ. এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। সর্বশেষ সপ্তম আকাশে হযরত ইবরাহীম আ. এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো এবং তিনিও সালামের জবাবদান প্রসঙ্গে বললেন, ‘খোশ আমদেদ! হে নেক পুত্র, হে নেক নবী!

এরপর আমাকে ‘সিদরাতুল মুন্তাহা’ [সিদরাতুল মুনতাহা হল সপ্তম আকাশে আরশের ডান দিকে একটি কুল জাতীয় বৃক্ষ, সকল সৃষ্টির জ্ঞানের সীমার শেষ প্রান্ত। তারপর কি আছে, একমাত্র আল্লাহই জানেন] নামক একটি সমুন্নত বরই গাছ পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেয়া হলো। এর ওপর অগণিত ফেরেশতা জোনাকির মতো ঝিকমিক করছিলো।’ এখানে হযরত মুহাম্মদ সা. অনেক গোপন রহস্য প্রত্যক্ষ করলেন। তিনি আল্লাহ তা’আলার সঙ্গেও কথাবার্তা বললেন। এ সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে,
فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى (১০) مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى (১১) أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى (১২) وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى (১৩)عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى (১৪) عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى (১৫) إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى (১৬) مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى (১৭) لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى

অর্থ: অতঃপর তিনি তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহী করার তা ওহী করলেন। সে যা দেখেছে, অন্তকরণ সে সম্পর্কে মিথ্যা বলেনি। সে যা দেখেছে, সে সম্পর্কে তোমরা কি তার সঙ্গে বিতর্ক করবে? আর সে তো তাকে আরেকবার দেখেছিল। সিদরাতুল মুনতাহার নিকট। যার কাছে জান্নাতুল মা’ওয়া অবস্থিত। যখন কুল গাছটিকে যা আচ্ছাদিত করার তা আচ্ছাদিত করেছিল। তার দৃষ্টি এদিক সেদিক যায়নি এবং সীমাও অতিক্রম করেনি। নিশ্চয় সে তার রবের বড় বড় নিদর্শনসমূহ থেকে দেখেছে।[সূরা আন নাজম:১০-১৮]

এ সময়ে আল্লাহ তা’আলা তার উম্মতের জন্যে দিন-রাত মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ফরয করে দিলেন। এ সব প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার পর তিনি যখন প্রত্যাবর্তন করছিলেন, তখন আবার হযরত মূসা আ. এর সঙ্গে সাক্ষাত হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলুন, খোদার দরবার থেকে কি উপহার নিয়ে যাচ্ছেন?’ হযরত মুহাম্মদ সা. বললেন, ‘দিন-রাতে পঞ্চাশ বার নামায।’ মূসা আ. বললেন, ‘আপনার উম্মত এতো বড় বোঝা বহন করতে পারবে না; কাজেই আপনি ফিরে যান এবং এটা কমিয়ে আনুন।’ হযরত মুহাম্মদ সা. আবার ফিরে গেলেন এবং নামাযের ওয়াক্ত কমানোর জন্যে আবেদন জানালেন। ফলে ওয়াক্তের সংখ্যা কিছুটা কমিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু মুসা আ. হযরত মুহাম্মদ সা. কে বারবার পাঠালেন এবং প্রত্যেক বারই সংখ্যা কমতে লাগলো। অবশেষে কমতে কমতে সংখ্যা মাত্র পাঁচটি রয়ে গেলো। এতেও হযরত মূসা আ. নিশ্চিত হলেন না, বরং তিনি আরো কম করানোর কথা বললেন। কিন্তু হযরত মুহাম্মদ সা. বললেন, ‘আমার আর কিছু বলতে লজ্জা করছে।’ এ সময় আল্লাহ তা’আলার তরফ থেকে এই মর্মে ঘোষণা এলো- ‘যদিও আমি নামাযের সংখ্যা কমিয়ে পঞ্চাশ থেকে পাঁচ করে দিয়েছি, তবু তোমার উম্মতের মধ্যে যারা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করবে, তাদেরকে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাযের পুরস্কার দান করা হবে।’ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ছাড়াও আল্লাহর নিকট থেকে আরও দু’টি উপহার সম্পর্কে সহীহ বর্ণনায় এসেছে,
قَالَ فَأُعْطِىَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- ثَلاَثًا أُعْطِىَ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسَ وَأُعْطِىَ خَوَاتِيمَ سُورَةِ الْبَقَرَةِ وَغُفِرَ لِمَنْ لَمْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ مِنْ أُمَّتِهِ شَيْئًا الْمُقْحِمَاتُ.
“একটি হচ্ছে সূরা বাকারার শেষ আয়াত সমষ্টি, দ্বিতীয় হচ্ছে এই সুসংবাদ যে, উম্মতে মুহাম্মদীর ভেতর যারা অন্তত শিরক থেকে বেঁচে থাকবে, তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে। [সহীহ মুসলিম:৪৪৯]

এই ভ্রমণকালে মুহাম্মদ সা. স্বচক্ষে জান্নাত এবং জাহান্নামও প্রত্যক্ষ করেন। মৃত্যুর পর আপন কৃতকর্মের দৃষ্টিতে মানুষকে যে সমস্ত পর্যায় অতিক্রম করতে হয়, তার কয়েকটি দৃশ্যও তাঁর সামনে উপস্থাপন করা হয়।

মহাকাশ থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি আবার বায়তুল মুকাদ্দাসে গিয়ে দেখেন যে, অন্যান্য নবীগণ সেখানে সমবেত হয়েছেন। তিনি নামায পড়লেন এবং সবাই তাঁর পেছনে নামায আদায় করলেন। এরপর তিনি নিজের জায়গায় ফিরে আসেন এবং ভোরবেলা সেখান থেকে সজাগ হন।

লেখক: প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, সপ্নীল গ্রুপ ফাউন্ডেশন
শিক্ষক, রায়হান স্কুল এন্ড কলেজ