Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

পুরুষ মানুষ হীরার আংটি

জেসমিন চৌধুরী
সেদিন রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস অবলম্বনে ঋতুপর্ণ ঘোষের বাংলা ছবি নৌকাডুবি দেখার পর ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম, ‘পুরুষ মানুষ হীরার আংটি’। জবাবে আসা মন্তব্যগুলোর বেশিরভাগই নিবদ্ধ ছিল ‘হীরা’ আর ‘আংটি’ কথা দু’টোর শাব্দিক অর্থের ওপর। এই বাক্যের পেছনে লুকিয়ে থাকা হাজার বছরের সামাজিক বঞ্চনা, নির্যাতন আর নিগ্রহের বিষয়টা সম্ভবত বেশিরভাগ পাঠকের বোধের বাইরেই থেকে গেছে।

নৌকাডুবির সুশীলার সলিলসমাধী ঘটার পর তার মা যখন তার বরকে আবার বিয়ে করার উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘পুরুষ মানুষ হীরার আংটি বাবা, তার আর বাঁকাঝোঁকা কী? তুমি আবার বিয়ে করো বাবা।’ সে কি আসলে বলতে চেয়েছিল, পুরুষমানুষ মাত্রেই সব্যসাচী, সর্বগুণের আধার, নারী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর? নাকি সামাজিক প্রেক্ষাপটে গুণাগুণ নির্বিশেষে পুরুষের প্রশ্নাতীত মূল্যায়নের বিরুদ্ধে একরকমের প্রতিবাদই ফুটে উঠেছিল সদ্য কন্যাহারা এই মায়ের ব্যথিত কণ্ঠস্বরে? বিয়ের রাতেই যার বৌ পানিতে ডুবে মরে যায়, তাকে যত সহজে আবার বিয়ে করার কথা বলা যায়, সদ্যবিধবা কোনও নারীকে কি তা বলা যায়, অন্তত আমাদের সমাজে? তাকে বলা হয়, ‘তুই অপয়া, বিয়ের রাতেই স্বামীকে খেয়েছিস। তোকে কে বিয়ে করবে?’ (ইঙ্গিত: নারীর সমাজ নেই।)

এই বিষয়ে এত কথা বলার আছে আমার, অনুভূতিগুলো এতই গভীর যে, আমি কথাগুলোকে সেই গভীরতা থেকে টেনে তুলে এনে ঠিকমতো গোছাতে পারি না। তাই এই চিন্তাগুলো আঁতুড় ঘরে পড়ে থেকে গোংরাচ্ছে আজ অনেকদিন ধরে, প্রকাশের আলো দেখতে পারছে না। যাই হোক, আমি বরং কয়েকটা অভিজ্ঞতার কথা বলি।

ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় ইসলামিক ফাউন্ডেশন সিলেট শাখা আয়োজিত সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় তিনটি বিষয়ে অংশ নিয়ে তিনটিতেই প্রথম পুরস্কার পেয়ে যখন আনন্দে তাইরে-নাইরে না করছি, তখন লক্ষ করলাম মেয়েরা সর্বোচ্চ তিনটি বিষয়ে অংশ নিতে পারলেও ছেলেদের বেলায় ওই নিয়মটি প্রযোজ্য ছিল না। আমার পরিচিত একটি ছেলে ছয়টি বিষয়ে অংশ নিয়ে পাঁচটিতে পুরস্কার পেয়ে আমার কাছে এসে বীরত্ব দেখাচ্ছিল। আমি এই অন্যায় সইতে না পেরে আয়োজকদের টেবিলের কাছে গিয়ে প্রতিবাদ জানালাম। ছেলেমেয়েদের মধ্যে বৈষম্য করা হচ্ছে কেন, তার কারণ জানতে চাইলাম। ফাউন্ডেশনের তৎকালীন মহাপরিচালক, যিনি অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করছিলেন, আমাকে চুপ থেকে দর্শক সারিতে বসতে বললেন। আর এ কথাও স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, তারা দয়া করে ছেলেমেয়েদের জন্য আলাদা গ্রুপ করাতে আমি এতগুলো প্রথম পুরস্কার পেয়েছি, একসঙ্গে হলে পেতাম না। আমার স্কুলের শিক্ষকরা এ কথা জানার পর আমাকে বেয়াদব বলে গালি দিলেন। সঙ্গের মেয়েরা বললো, আমার অনেক সাহস, কিন্তু আমার প্রতিবাদে পাশে দাঁড়ালো না কেউ। মেয়ে হিসেবে আরও অনেকের মতো আমিও অনেক অনর্থক অপমান গায়ে মেখে বড় হয়েছি। ওপরের ঘটনার পর তেত্রিশ বছর পার হয়েছে কিন্তু নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে সমাজ তেত্রিশ মিলিমিটারও আগায়নি। আজও প্রতিবাদ করলেই চুপ করতে বলা হয়, আঙুল তুলে দর্শকের চেয়ার দেখিয়ে দেওয়া হয়।

একটি ‘ছোট’ ঘটনার কথা বলি। গায়ে জ্বর নিয়ে এক দেবরের বাড়ি দাওয়াত খেতে গেছি। বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গল্প হচ্ছে। তার তিন মেয়ে এক ছেলে, ছেলেটা সবার ছোট। ছেলেটা খুবই বুদ্ধিমান, সে বড় হয়ে ব্যারিস্টার হবে, এই বাড়িকে লোকে ব্যারিস্টার বাড়ি বলবে। এসব গল্পের ফাঁকে যখন সবাই হাসিতে ফেটে পড়ছিলেন, ফুটফুটে মেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার তখন চোখ ভিজে উঠছিল।

ভাই ব্যারিস্টার হবে, তাদের বাড়িকে লোকে ব্যারিস্টার বাড়ি বলবে, এই খুশিতে হাসছে মেয়েগুলোও। কিন্তু তারা নিজেরা বড় হয়ে কী হবে? তাদের নামে নাম হবে কোন বাড়ির? ভাবছে না কেউ। শুধু বড় মেয়েটার ইদানিং বিয়ে ঠিক হয়েছে, সেটা নিয়ে গল্প হলো অনেক। জ্বরের সময় আমি সহজে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। চোখের পানি লুকাতে উঠে অন্য ঘরে চলে গেলাম, তাত্ত্বিক আলোচনায়/বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার শারীরিক শক্তি ছিল না বলে। (ইঙ্গিত: নারীর ঘর নেই)

গত সপ্তাহে দোভাষী হিসেবে কাজ করতে গিয়েছি একটা হোম ভিজিটে। একজন ইংরেজ সোশাল ওয়ার্কার ও এক বাঙালি দম্পতির জন্য দু’জন দোভাষী আনা হয়েছে। স্বামী শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী, তার জন্য সাইন ল্যাংগোয়েজ স্পেশালিস্ট আর স্ত্রী ইংরেজি বলতে পারেন না, তার জন্য আমাকে আনা হয়েছে।

কাজের ফাঁকে পরিবারটির ইতিহাস বুঝে নিলাম। ভদ্রলোক জন্ম-প্রতিবন্ধী, বাংলাদেশ থেকে বিয়ে করে এনেছেন বৌকে পনেরো বছর হলো। মহিলা শিক্ষিত নন কিন্তু দেখতে শুনতে ভালো, সপ্রতিভ, কর্মঠ। তাদের তিনটি সন্তান আছে, তিনজনই সুস্থ এবং স্বাভাবিক। সৌভাগ্যক্রমে ভদ্রলোকের জন্ম এবং বৃদ্ধি এদেশেই। ফলে তিনি সাইন ল্যাংগোয়েজে শিক্ষিত হয়েছেন যদিও চাকরিবাকরি করতে পারেন না। ভদ্রলোকের স্ত্রী একফাঁকে আমাকে জানালেন, যখন তার পরিবার এই লোকের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক করেছিল, তিনি খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন তার বাচ্চারাও হয়তো প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেবে, কিন্তু আল্লাহর রহমতে তারা ঠিক আছে। জীবন নিয়ে তার আর কোনও অভিযোগ নেই।

একটা মানুষের শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধিতা তার স্বাভাবিক জীবন বাঁচার পথে প্রতিবন্ধক হতে পারেনি দেখে ভালো লাগলো কিন্তু একইসঙ্গে একটি বিপরীত চিত্রও কল্পনা করার চেষ্টা না করে পারলাম না।

একজন প্রতিবন্ধী নারী- কথা বলতে পারে না, চোখে অল্পস্বল্প দেখে, হাত-পাগুলো বাঁকা বলে নিজে একা হাঁটতে পারে না। সে বাংলাদেশ থেকে বিয়ে করে এনেছে একজন সুঠাম-দেহী পুরুষকে। লোকটা তেমন শিক্ষিত না কিন্তু দেখতে শুনতে ভালো। এ রকম একটি চিত্র কল্পনা করা সম্ভব, কারণ লাল পাসপোর্টওয়ালা লাশকে ও বিয়ে করবে বাঙালি পুরুষ। কিন্তু পনেরো বছর ধরে সেই বিকলাঙ্গ নারীর সঙ্গে ঘর করা? তিনটি বাচ্চার জন্ম দেওয়া? সমস্ত দিন প্রতিবন্ধী স্ত্রীর সেবাযত্ন করা? কল্পনা করতে পারেন এমন একটা দৃশ্যপট? আমি পারি না, আমার কল্পনাশক্তি কম।

পর দিন কলেজে আমার এক ইংরেজ সহকর্মীকে এ রকম একটি কাহিনি কল্পনা করতে বললাম, সে বলল সেও পারছে না। আমরা একমত হলাম যে, একজন পুরুষ শুধু কোনও ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য এ রকম একজন নারীকে বিয়ে করতে সম্মত হতে পারেন কিন্তু উদ্দেশ্য চরিতার্থ হওয়া মাত্র তাকে ছেড়ে চলে যাবেন। আপনারা আবার দয়া করে সারাবিশ্বের ইতিহাস ঘেটে দুই-একটা ব্যতিক্রম এনে হাজির করবেন না। কারণ ব্যতিক্রম এসব ক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে না। (ইঙ্গিত: নারীর দেশ নেই)

নারীর সমঅধিকারের কথা বলতে গেলেই অনেকে ছুটে আসেন গায়ে ‘নারীবাদী’ স্ট্যাম্প মারতে। তারা বলেন ‘নারী আর পুরুষ তো প্রকৃতিগতভাবেই আলাদা, তাদের সমধিকারের দাবি বাতুলতা মাত্র’। দেখুন, আমাদের আন্দোলন প্রকৃতিগত ভিন্নতা নিয়ে নয়। আপনারা প্রয়োজনে গাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তার পাশে প্যান্টের চেইন খুলে প্রস্রাব করবেন, আমরা দুইঘণ্টার জ্যামে প্রস্রাব আটকে বসে থেকে ইউরিন ইনফেকশনের পথ প্রশস্ত করব। প্রকৃতিগত ভিন্নতার দোহাই দিয়ে এও না হয় মেনে নিলাম, কিন্তু বাকিটার কী হবে?

তাসলিমা নাসরিনের কথার প্রতিধ্বনি করে আমরা যখন বলি, নারীর দেশ নেই, ঘর নেই, ধর্ম নেই, সমাজ নেই; তখন যারা ক্ষেপে যান, তারা কি একবার ভেবে দেখেছেন, নারীর এই বিষয়গুলো না থাকাটা কতটা সহজে মেনে নিয়েছেন আপনারা? অথচ নারী এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলেও হয় তাকে নিয়ে বিদ্রূপ করবেন, নয় তো লাঠি নিয়ে তেড়ে আসবেন। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে আছে যার তাকে তাড়িয়ে আর কোথায় নেবেন আপনারা? লাঠি দেখালেও সে সামনের দিকেই আসবে, কারণ তার আর পেছনে যাওয়ার জায়গা নেই।

তাই বলি আপনারা হীরার খণ্ড/পিণ্ড/আংটি হয়েই থাকুন সমস্যা নেই। আমরা লোহা হব, আগুনে পোড়ানো পেটানো শক্ত লোহা যে কারও আঙুলে শোভা পাবে না বরং হাতুড়ি আর পেরেক হয়ে সমাজের সব অসামঞ্জস্যকে মেরামত করবে। হাজার বছরের পুষ্পিত শৃঙ্খলের প্রেমে পড়ে থাকা নারী সমাজের ঘোর কাটতে হয়তো আরও সময় লাগবে কিন্তু পরিবর্তনের জোয়ার শুরু হয়েছে, একসময় তা তীরে এসে পৌঁছাবেই।

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক