Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

আজ মহান বিজয় দিবস

আহমাদ কামাল
৪৫ বছর আগে বাংলার দামাল মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তি পাগল মানুষের যূথবদ্ধ প্রতিরোধ লড়াইয়ের মুখে উধাও হয়েছিল পাকিস্তানি বর্গীরা। একাত্তরে ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের বরমাল্য পরেছিল বাঙালি জাতি। লাখো মানুষের আত্মাহুতি, হাজারো নারীর সম্ভ্রম, আবাল বৃদ্ধ বনিতার অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও ত্যাগের মধ্যে অভ্যুদয় ঘটে বাঙালির স্বাধীন আবাসভূমি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের। ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে আমাদের এ বিজয়, আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা।

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পথ ধরে স্বাধীনতা প্রাপ্তির এ দিন শুধু বিজয়ের নয়, আজ স্বাধীনতার বিজয় অক্ষুণ্ন রাখার শপথেরও দিন। আজ বিজয়ের আনন্দে হাসছে বাংলাদেশ। কুয়াশার চাদর ভেদ করে পৌষের শিশির স্নিগ্ধ সকাল প্রত্যক্ষ করছে বিজয় দিবসের হিরন্ময় সূর্য। আজ বিজয় দিবসের সূর্যালোকে ভাসবে গ্রাম বাংলার শিশির ভেজা শস্যক্ষেত, পদ্মা মেঘনা যমুনার কূল, বঙ্গোপসাগর বিধৌত বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের এই দিনে বিজয়ের আনন্দ ও স্বজন হারানোর বেদনার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে সমগ্র জাতি আজ উদযাপন করছে মহান বিজয় দিবস। যে মহান নেতা সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন, জাতি আজ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করবে স্বাধীনতার সেই মহাপুরুষ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব পাকিস্তানের জান্তা শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনের সময় ১৯৭১ এর ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে সশস্ত্র মুক্তি সংগ্রামের প্রস্তুতির নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’-এ উচ্চারণে বঙ্গবন্ধু যে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন সেই লক্ষ্যে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ অর্জনের প্রত্যয়ে এদেশের দামাল ছেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে।

১৯৭১ এর ২৫ মার্চ মধ্যরাতের আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অতর্কিত হামলা চালালে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর পূর্ব প্রস্তুতি অনুযায়ী ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ আজ থেকে স্বাধীন’ ঘোষণা দিয়ে হানাদার শত্রুকে প্রতিহত করার উদাত্ত আহ্বান জানান। স্বাধীনতার ঘোষণায় দুর্বার প্রতিরোধ জেগে ওঠে তিতুমীর-সূর্যসেনের বাংলাদেশ। শুরু হয় জনযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস নির্বিচারে গণহত্যা, নারী নির্যাতন, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তাদের এই নির্বিচার হত্যাযজ্ঞে মদদ দেয় এদেশেরই কিছু লোক।

তারা রাজাকার, আলবদর, আলশামস গঠন করে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালি নিধনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। জামায়াতে ইসলামীসহ তাদের কিছু দোসর দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে শপথ নেয় বিপ্লবী বাংলাদেশ সরকার। মুজিবনগর সরকার হিসেবে পরিচিত এই প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ শেষে ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৯৩ হাজার সৈনিক।

সেই ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা’ মহান বিজয় দিবস আজ। সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে বাঙালি জাতির সর্বোচ্চ অর্জনের মহান একটি দিন। শৃঙ্খলমুক্তির লালিত স্বপ্ন পূরণের দিন। কৃতজ্ঞ জাতি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে আজ স্মরণ করবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সেই অকুতোভয় বীরদের, শ্রদ্ধাবনতচিত্তে আরো স্মরণ করবে স্বাধীনতার অগ্রনায়ক মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদসহ অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের কর্ণধারদের, যারা সুযোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর সৃষ্টি করেছিলেন বাঙালির নতুন ইতিহাস, গৌরবের বীরগাথা।

আনন্দ-বেদনার দিনটিতে কৃতজ্ঞ জাতি আরো স্মরণ করবে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান দামাল মুক্তিযোদ্ধাদের। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে চিরভাস্বর হয়ে আছে ৩০ লাখ বাঙালির রক্তে রাঙা ইতিহাস আর লাল-সবুজের পতাকা। একসাগর রক্তের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। সারাদেশে স্মৃতির মিনারগুলো আজ ছেয়ে যাবে ফুলে ফুলে। যতদিন বাংলাদেশ নামক এ রাষ্ট্রটির অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন এ দিনটি পালন করা হবে এমনই হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে। চিরকৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি হৃদয় উজাড় করা শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিয়ে গাইবে ‘একসাগর রক্তের বিনিময়ে/বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা/আমরা তোমাদের ভুলবো না’।

পয়তাল্লিশ বছর দীর্ঘ সময় আমাদের জীবনে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো ছোট্ট একটি দেশের জন্য শৈশব। ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর ছিল বহু ত্যাগের বিনিময়ে এক গৌরবময় প্রাপ্তি। স্বাধীনতাপূর্ব শোষকদের শোষিত-নিঃশেষিত এক বাংলাদেশকে আমরা অর্জন করেছি আমাদের সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে। ১৯৪৭-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ নয় বছর পর ১৯৫৬ সালে প্রথম সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, যেখানে জনসাধারণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত ছিল। কিন্তু সেই সংবিধান স্বৈরাচারী আইয়ুব খান রদ করেন এবং মৌলিক গণতন্ত্রের নামে এক প্রহসনের গণতন্ত্র বাঙালি জাতির ওপর চাপানোর বৃথা চেষ্টা করেন। পাকিস্তান আমলে প্রণীত কোন সংবিধানই জনপ্রতিনিধি দ্বারা গৃহীত হয়নি।

স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মধ্যেই ১৯৭২-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান প্রণীত হয় এবং মূল স্তম্ভে বলা হয়, জনগণই প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে। এ সংবিধানের তৃতীয় ভাগে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করা হয় এবং অনুচ্ছেদ ২৬-এ ঘোষণা করা হয় যে, সংবিধানে সংরক্ষিত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী কোন আইন প্রণয়ন করা যাবে না। আজ বাংলাদেশের বয়স ৪৫ বছর। অর্জিত হয়েছে অনেক সাফল্য, বাস্তবতা পেয়েছে অনেক স্বপ্ন। স্বাধীন বাংলার সাংবিধানিক যাত্রা শুরু গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সাম্য ও নাগরিক অধিকারের লক্ষ্যে।

এ দীর্ঘ সময়ে অনেক অস্ত্রোপচার হয়েছে আমাদের সংবিধানে; কখনও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে, ধর্মনিরপেক্ষতা, জরুরি অবস্থা ও মানবাধিকার নিয়ে স্থগিত করার বিধান করা হয় নাগরিকের মৌলিক অধিকারের। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রত্যয়ী সব কান্ডারি কতটুকু সফল হয়েছেন তার প্রমাণ মিলে আমাদের মৌলিক অধিকার কতটুকু সংরক্ষিত তার বিচার-বিশ্লেষণ থেকে। আজ এ কথা মোটেই অস্বীকার করা যাবে না যে যোগ্য কাণ্ডারির অভাবে এ দেশ আজ অবধি শৈশব পেরোতে পারেনি। জাতি হিসেবে ভুলে গেলে চলবে না, কান্ডারি যত দুর্বলই হোক না কেন সলিল সমাধি হলে রক্ষা পাবে না কেউই। জেগে উঠতে হবে সবাইকে এক হয়ে।

পয়তাল্লিশ বছরের অর্জিত বিজয় যেন ফ্রেমে বাঁধা ছবি, কুচকাওয়াজ আর পতাকা উত্তোলনে সীমাবদ্ধ না থাকে, সত্যিকারের বিজয় মূর্ত হোক শহীদদের স্বজনের চোখে-মুখে, গ্রামে গঞ্জে, রাজনৈতিক ভ্রাতৃত্বে আর নেতৃত্ব্বে। বিজয় হোক ত্যাগে।

লেখক: সাংবাদিক