Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

শিক্ষা ও সনদ বাণিজ্য

আহমাদ কামাল
পৃথিবীর সমস্ত মানুষ জাতির উন্নতির মানদণ্ডই হল শিক্ষা। মানুষের সুখী হওয়ার জন্যে সবচেয়ে বেশি দরকার বুদ্ধির – এবং শিক্ষার মাধ্যমে এর বৃদ্ধি ঘটানো সম্ভব। মানুষ জাতির জন্য অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর পথে ফিরে আসতে শিক্ষার কোন বিকল্প আজও তৈরী হয়নি,ভবিষ্যতেও হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। আমরা অনেক সময় নিজের দুর্বলতাকে সক্ষমতার দুর্বল চাদরে ঢেকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করি। কিন্তু এই দুর্বলতা এক সময় সুনামির মত শক্তিশালী হয়ে প্রচণ্ড আঘাত করে সক্ষমতার রঙ্গিন দেয়ালে অক্ষমতার কালো রং লেপে দেয়। আর যেহেতু এখন শিক্ষাকে আর দশটা পণ্যের মতোই গন্য করা হচ্ছে। স্বভাবতই সে শিক্ষার বাজারই এখন রমরমা, যে শিক্ষা বাজারে অর্থ মূল্যে কিনতে পাওয়া যায়।

আজ বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে। বাজারি শিক্ষকগণ যথেষ্ট সম্মান পাচ্ছেন। সম্মানটা বাজারের নিয়ম মেনে নগদ মুদ্রাতেই পরিশোধিত হচ্ছে। অথচ আমরা জানি, শিক্ষা কোন পণ্যদ্রব্য নয়, শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। সাধারণত পণ্যদ্রব্যের জন্যেই বাণিজ্য প্রযোজ্য। অথচ মানুষের মৌলিক অধিকার যেই শিক্ষা সেই শিক্ষাকে ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থে হরেক রংয়ের রংয়ে রাঙ্গিয়ে পণ্যের মত মোড়কে মুড়িয়ে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে উপস্হাপন এবং প্রচারেই প্রসার মন্ত্রকে উপজীব্য করে অসৎ বেনিয়া ব্যক্তি ও গোষ্ঠী লুটেপুটে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ সহ তেলতেলে মাগুর মাছ হচ্ছে। এই বেনিয়া ব্যক্তি ও গোষ্ঠী দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে জেঁকে বসেছে জগৎ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ঘাঁড়ে। যেহেতু পুরনো ধ্যান ধারণা আর ঐতিহ্য এক বিষয় নয়। নতুন আর পুরাতনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় উর্ত্তীন যে কোন ব্যবস্থাপনা ঐতিহ্য হিসাবে সর্বাবস্হায় স্বীকৃত। ঐতিহ্য যে কোন সমাজের ভিতকে শক্তিশালী করে বিধায় নতুনের জয়গান গেয়ে ঐতিহ্যকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য ভূয়া শিক্ষাসনদধারী সমাজপতিদের জ্ঞানোপদেশ সমাজ ব্যবস্থায় অপূরণীয় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

একজন শিক্ষকের সম্মান জন্মদাতার চেয়েও বেশি। কেননা একজন জন্মদাতা একটি জীবনের জন্ম দেন। আর একজন শিক্ষক সেই জীবনকে তার কষ্টার্জিত সাধনালব্ধ জ্ঞান দিয়ে সুন্দরভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে সর্বগুনে গুনান্বিত সহকারে পরিপূর্ণ মানুষ করে তোলেন। এতটা সম্মান যে শিক্ষকের প্রাপ্য সেই শিক্ষককে কতটা অসম্মান করা যায় সেটাই যেন জোরালো ভাবে জানান দিয়েছে নারায়ণগঞ্জের প্রধান শিক্ষককে কান ধরে ওঠ-বস করার ঘটনা। অপর দিকে যেমন সন্মান মানুষের জন্মগত অধিকার। আর সন্মানের অভাব যে সমাজে প্রকট, দয়া বা করুণা অথবা অনুদান সেখানে সবল। আর এ জন্যেই শিক্ষা এবং শিক্ষক আজ ভূলুন্ঠিত ও মৃতপ্রায়। অশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত এবং ভূয়া শিক্ষা সনদধারীদের দাপটে আজ প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও একজন শিক্ষক প্রকাশ্য গণসমাজে অপমানিত, লাঞ্চিত এবং ধিকৃত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার স্বীকৃতি মেলে সনদে, অথচ পণ্যশিক্ষার সাথে সাথে চলছে শিক্ষাসনদ নিয়ে বাণিজ্য। আর এ দুই বাণিজ্যই মনুষ্যজীবনে উন্নতির প্রথম এবং প্রধান অন্তরায়। আর তারই ফলশ্রুতিতে সমাজে এখন মূর্খদের রাজত্ব চলছে। দেশে কীভাবে ক্ষমতাধরদের দাপট চলছে, নারায়ণগঞ্জের শিক্ষককে কান ধরে ওঠ-বস করার ঘটনা তার একটি সামান্য নমুনা মাত্র। তাই শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড আপ্ত বাক্যটি আজ বিলীন হতে বসেছে কালের গহবরে।

রাষ্ট্রের উন্নয়নের চাকা ধীর গতিতে চলতে চলতে ক্রমান্বয়ে গতিশীলতা লাভ করে এটাই চরম বাস্তবতা। কিন্তু গতি হারানোর কারণ কী ? এটা জানতে ও বুঝতে হলে যা আমাদের খুজতে হবে তাহলো, সমাজ কতগুলো সম্পর্কের উপর নির্ভর করে, তার মধ্যে প্রধান হলো সমাজের সাথে শিক্ষকের সম্পর্ক। তাই যখন প্রকাশ্য সমাজে শিক্ষক নিঃগৃহীত হন তখন বুঝতে হবে লোমশ কালো হাতে ক্ষমতার খারাপ প্রয়োগ হচ্ছে। আমাদের দেশের তুলনায় অনেক দেশ উন্নয়নশীল ও উন্নত, এক্ষেত্রে একেক জন একেক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলেও জাতীয় উন্নতির মূল সোপান হলো শিক্ষা। অথচ সারা বিশ্বেই এমন কিছু দেশ আছে যে দেশগুলো বাস্তবেই দুর্নীতিগ্রস্ত । সে দেশগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতির বিষ মিশে আছে বাকী নেই শিক্ষা ক্ষেত্রেও। দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আগের তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও শিক্ষা ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিষবাষ্পে ঝাপসা হয়ে গেছে অনেক সেক্টরের ভবিষ্যৎ। আমাদের দেশে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র আছে যে কর্মক্ষেত্রে অতিগুরুত্বপূর্ণ পদে লেবাশধারী শিক্ষিত জনেরা বসে আপন মেধা ও মননে স্বহস্তে কলকাঠি নাড়ছে, আর সাপের লেজের মতো উন্নত মানের মেধাগুলো শুধু আজ্ঞাবহন করে চলেছে। আর এখানেই আটকে আছে রাষ্ট্রের উন্নতির চাকা। অথচ সুশীল সমাজ, প্রগতিশীল সমাজ, প্রগতিবাদীরা টেলিভিশনের পর্দায়, মঞ্চে, মুক্তমঞ্চে আর জনসভায় উন্নয়নের জয়গান গাইছেন প্রতিদিন। লেবাশধারী শিক্ষিত আর বুলি শেখানো সুশীল নাগরিকের তবে পার্থক্য কোথায় ?

তারা প্রতারণা করছে মানুষের সাথে, সমাজের সাথে, রাষ্ট্রের সাথে। তাদের প্রতারণায় অনেক দূরে পিছিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্র, তথা রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও মর্যাদা। যারা ভূঁয়া শিক্ষাসনদে লেবাশধারী শিক্ষিত তাদেরকে কী বা কোন উপাধিতে সম্বোধন করা যায়, রাষ্ট্রদ্রোহী বীরপুরুষ, লুটেরা নাকি লম্পট ? এই প্রতারক শ্রেণী এক শ্রেণীর অসহায় মানুষকে গোলক ধাঁধার সর্বনাশা ফাঁদে আটকিয়ে শুধু নিজেদের ফায়দা লুটে নিচ্ছে। সবার চোখে ধুলো দিয়ে সুবিধাবাদী গোষ্ঠী বহালতবিয়তে! শুধু বহালতবিয়তেই নয়, তারা গাছেরটা, তলেরটা-সবটাই হজম করছে। নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শ সবটাই এভাবে ধূলিস্যাৎ হচ্ছে। মুক্তির পথ কি আছে কোন ? না নেই। কারণ, চুরি আর লুকোচুরির অর্থ সহজ কথায় অন্যের অধিকার হতে কোন কিছুকে হরণ করা বুঝায়। তবে তফাৎ হলো চুরি প্রকাশ্য আর ধৃত কিন্তু লুকোচুরি গোপনীয় আর ধরাছোঁয়ার বাহিরে। মজার ব্যাপার হল চুরির প্রভাব তাৎক্ষনিক ও সাময়িক কিন্তু লুকোচুরির প্রভাব প্রলম্বিত ও দীর্ঘস্থায়ী।

এ লুকোচুরির প্রভাব এমন যে এটা কোন একসময় একটি দেশের পুরো নিয়ম নীতি ও আনুষাঙ্গিক সিস্টেমকে গিলে খেয়ে ফেলে । একাত্তর শিক্ষা দিয়েছে আমাদেরকে ‘বাঙ্গালি হারতে জানে না’। বাঙ্গালির বীরত্বগাঁথা পৃথিবীর ইতিহাসের পরতে পরতে মিশে আছে। কেউ কেউ চোখ বন্ধ করলে পরিস্কার দেখতে পায়, কেউ পায় ঘ্রাণ। অথচ আজ সেই সোনালী ইতিহাস পুড়ে পুড়ে ছাড়খার হচ্ছে। শিক্ষার অন্তরালে আজ যে বাণিজ্য নতুন প্রজন্মকে অজানা গন্তব্যে ঠেলে দিচ্ছে, যে অসঙ্গতিপূর্ণ শিক্ষানীতি চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে এ দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীর ছোট্টো মাথার ওপর, যে মধুর বাক্যালাপের মাধ্যমে নির্বোধ অভিভাবকদের কল্পনার স্বপ্নলোকে নিয়ে যাচ্ছে অসাধু বেনিয়াচক্র তাদের ভণ্ডামিতে আমাদের প্রজন্মের গন্তব্যের কোন শেষ নেই। তাছাড়াও এ দেশের অনেক বড় বড় মাথা আছে যারা শুধু মাথা বলেই খ্যাত আসলে সে মাথায় কোন সঠিক ও সুস্হ মগজ নেই। এই মগজবিহীন মাথার খুলি থেকে এদেশের জন্য কোন সুকর্মের সুচিন্তা আসতে পারে না, আসলে এটা বৈজ্ঞানিকভাবেও অসম্মত হতে বাধ্য। কারণ, যে দেশে টাকা হলেই প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যে কোন পাশের সনদ পাওয়া যায় ।

যে দেশে ঘরে বসে ইচ্ছা ও প্রয়োজন মাফিক যে কোন ডিগ্রী নেয়া যায় সে দেশের মেধার বিকাশ ও উন্নয়ন এর চেয়ে বেশি আর কী হতে পারে এবং আশা করা যায় ? তবে বলতে অসুবিধে কী ? শিক্ষা বাণিজ্য, সনদ বাণিজ্যই এ দেশের উন্নতির প্রধান অন্তরায় ? ভূয়া সনদধারী যারা উচ্চ মোকামে আসীন, তারা যদি হয় কোন কোন সেক্টরের কর্ণধার তবে তাদের কাছ থেকে প্রাপ্য সেবা এমন কী কাজে লাগতে পারে ? যে কাজে দেশের সুদূরপ্রসারী চরম ক্ষতি ছাড়া পরম উন্নতি হবে । দেশের ভূখন্ডে ভূয়াদের দাপট। ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা, ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সচিব, ভূয়া পুলিশ, ভূয়া ডাক্তার, ভূয়া ম্যাজিস্ট্রেট, ভূয়া সেনা কর্মকর্তা, ভূয়া সাংবাদিক, ভূয়া এ্যাডভোকেট আরও কত কি। ভূয়াদের ভিড়ে এবং ভুলে এই ভূখন্ডের উন্নতি কতটা বাস্তব ?? তাইতো আমরা নিকট অতীতে দেখেছি ভূয়াদের মুখোশ উন্মোচিত হতে। ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি নেয়ার অভিযোগে ১৯ পুলিশ সদস্যকে। মুক্তিযোদ্ধার ভূয়া সার্টিফিকেট দেখিয়ে চাকরির মেয়াদ বাড়ানো ও অন্যান্য সুবিধা নেয়া চার সচিবসহ প্রশাসনের শীর্ষে অবস্থানকারী অন্যদের। শুধু পুলিশ কনস্টেবলের চাকরি নয়, সরকারি উচ্চপদের চাকরিতে থেকে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সার্টিফিকেট দেখিয়ে চাকরির মেয়াদ বাড়িয়ে নেয়ার ঘটনায় চার সচিবের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার এমন ভয়াবহ অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও উনারা বহাল তবিয়তে বিরাজমান।

প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে থেকে জাল-জালিয়াতির আশ্রয় যারা নেয়, তাদের অপরাধ সীমাহীন। কারণ, জেনে-বুঝেই তারা এটা করেছে। তাতে সহজেই অনুমান করা যায় যে, দেশ ও জাতির উন্নয়ন নয়, ভূয়া শিক্ষাসনদধারী ব্যক্তি বিশেষ নিজেদের অর্থ-বিত্তের চাকচিক্য ও বেশ-ভূষণই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। সরল এবং সাবলীল কথায় বলতে গেলে সর্বত্র উন্নয়ন হয় সঠিক সময়ে সঠিক কাজের ফলে, আর প্রকৃত কাজ তো করে একনিষ্ঠকর্মী বা কর্মীবাহিনী, আমাদের দেশের কর্মীদের কতটুকু এবং কী খ্যাতি আছে ? সব খ্যাতির অর্জনকারী তো বিভাগীয় কর্মকর্তা, বিভাগীয় প্রধান, সোনালী পদক, রূপালী পদক তো তাদের জন্যই। অথচ কোন প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা নেই, দক্ষতা নেই, শুধুমাত্র ভূয়া সনদধারী এমন অনেক মগজবিহীন মাথাওয়ালায় বোঝাই হয়ে আছে এ দেশের অনেক বড় বড় চেয়ার। এমন ভয়াবহ অপরাধের অপরাধীরা গিরগিরিটির মতো শুধুই কেবল রূপ পাল্টায়। যাদের নিঃশব্দ এবং সু-কৌশলী ছোবলে দেশ তথা দেশের মানুষ অতিমাত্রায় প্রতারিত হয়ে ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে।

অন্ধকারই আজ জাতির জন্য নতুন এক জগত কারণ এ জাতি কখনো তো অন্ধকার দেখেনি। টাকায় কেনা সনদধারীদের মগজবিহীন মাথা এর চেয়ে ভালো কোন দিকনির্দেশনা দিতে পারে না। তবে এ দায় কার ? সনদধারীর নাকি সনদ প্রদানকারির ? দেশে প্রচলিত ফৌজদারী আইনের ৪২০ ধারা মতে, এ দেশের আইনের ধারা …???? কারণ, অপরাধ তো অপরাধই। এই জালিয়াতদের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। অতএব সাজা দ্বিগুণ হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

লেখক: সাংবাদিক।