Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

শাহাদাতের রক্তে রঞ্জিত কারবালা

আহমাদ কামাল:
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কলিজার টুকরা, খাতুনে জান্নাত নবী নন্দিনী হজরত ফাতেমা (রা.) এর আদরের দুলাল হজরত হোসাইনের কারবালার প্রান্তরে শাহাদাতের ঘটনা এ পৃথিবীর এক করুণ ইতিহাস। কারবালার ঘটনা একটি বিশ্ববিদ্যালয় তুল্য। যেখানে দুগ্ধপোষ্য শিশু হতে শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধ লোকও মানব জাতির সামনে মানব মর্যাদা ও স্বাধীন চেতনার শিক্ষা দেন। যেখানে স্বপরিবারে ইমাম হোসাইন (রা.) ও তাঁর সহচরদের পবিত্র রক্ত ইসলামকে নতুন জীবন দান করে, আর উমাইয়্যা বংশের নষ্ট চরিত্রের শাসকদের পতনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলা উত্তম জিহাদ’ এ মহান আদর্শই হজরত হোসাইন (রা.) আমাদের সামনে রেখে গেছেন। আমিরে মুয়াবিয়া (রা.) এর ছেলে ইয়াজিদ পাপিষ্ঠ লোক ইসলামী খেলাফতের চালিকাশক্তি হবে, রাসূলে খোদার নাতি হয়ে ইমাম হোসাইন (রা.) তা মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই তিনি ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। ইমাম হোসাইন (রা.) এর লক্ষ্য ছিল উমাইয়া শাসকগোষ্ঠীর স্বরূপ উন্মোচন করে মানুষের অন্তরাত্মা ও বিবেককে জাগিয়ে তোলা, প্রকৃত ইসলামী আদর্শকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

তিনি মক্কা থেকে কারবালা যাওয়ার পথে বিভিন্ন ভাষণে সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন, আমার যাত্রার উদ্দেশ্য হলো অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা। আল কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী মুহাম্মদি দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করা ছাড়া আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। ইমাম হোসাইন (রা.) এর শাহাদাতের ঘটনা আজও মানব সমাজকে সত্যের পথে সংগ্রামে উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছে। ইমাম হোসাইন (রা.) তার জীবন দিয়ে সবার সামনে এটা স্পষ্ট করে গেছেন, সমাজে যখনই জুলুম, নির্যাতন, অনাচার প্রাধান্য বিস্তার করবে এবং ন্যায় ও সত্যের আলোকে নিভিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলবে তখন প্রকৃত মুসলমানদের চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। ধর্মীয় আদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সোচ্চার হতে হবে।

হিজরি ৬০ সনে ও ইংরেজি ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে এ দিনে ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে স্মরণকালের মানব ইতিহাসের নির্মমতম হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়। ইয়াযীদ ক্ষমতাসীন হবার পর ইমাম হোসাইন তাকে অযোগ্য বলে মনে করতেন বিধায় তার হাতে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। আর ইয়াযীদের স্বরূপ উদ্ঘাটনের জন্য আল্লাহ তা’আলার হুকুমে মদীনা থেকে মক্কায়, এরপর কুফা ও কারবালার দিকে রওয়ানা হন।

মুসলমানেদর প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) সপরিবার ও তাঁর সহচরবৃন্দসহ তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ইসলামের দুশমনদের হাতেএদিন ফোরাতের কিনারে শাহাদতের পানি পান করে শাহাদাত বরণ করেন। নীতি ও আদর্শের জন্য, সত্য ও ন্যায়ের জন্য অবলীলায় প্রাণ উৎসর্গ মানব ইতিহাসে সত্যিই বিরল।  তাঁর হত্যাকারী : সালেহ ইবনে ওয়াহাব মুযনী, সিনান ইবনে আনাস ও শিমর ইবনে যিল জওশন (তাদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হোক)।

ইসলাম ধর্মে ১০ মহররম অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বরকতময় একটি দিন। পবিত্র মাহে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে এই উম্মতের ওপর এদিনের রোজা ছিল ফরজ।  রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পর এই রোজা নফলে পরিণত হয়। এ দিনে প্রাচীন আরবরা কাবা ঘরের দরজা দর্শনার্থীদের জন্য খোলা রাখত।

আল্লাহ তায়ালা মহররম মাসের ১০ তারিখকে কারবালার ঐতিহাসিক বিরল দৃষ্টান্তের জন্যও মনোনীত করেছেন। এ দিনে নবী দৌহিত্র হজরত হোসাইন (রা.) ও তার পরিবারবর্গ যে আত্মত্যাগের মহা বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অপূর্ব। অপ্রতিরোধ্য বাতিল ও শয়তানি শক্তির বিরুদ্ধে তেজোদীপ্ত ঈমানদারের দুর্বল প্রতিরোধের যে ইতিহাস আশুরার দিনে কারবালা প্রান্তরে রচিত হয়েছে, তা অনন্য ও কালজয়ী। যুগ যুগ ধরে এ ঘটনা মানুষকে বাতিলের বিরুদ্ধে প্রত্যয়ী হওয়ার প্রেরণা জোগায়।

আশুরার পবিত্র দিনটি শুধু একারণেই তাৎপর্যবহ ও গুরুত্বের আসন পায়নি; বরং মানব ইতিহাসে বহু তাৎপর্যবহ ও পুণ্যময় ঘটনা জড়িয়ে আছে এ দিনটির সঙ্গে।

এ দিনেই আল্লাহতায়ালা হজরত আদম আলাইহিস সালামের তওবা কবুল করেছিলেন।  হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ওপর নমরূদ কর্তৃক প্রজ্বলিত ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডকে ঠাণ্ডা ও আরামদায়ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এদিনেই আল্লাহতায়ালা হজরত মুসা (আ.) কে স্বজাতি বনী ইসরাঈলসহ ফেরাউনের অত্যাচার থেকে নাজাত দিয়েছিলেন। এই পৃথিবী সৃষ্টি, হজরত আইয়ুব (আ.)-এর কঠিন পীড়া থেকে মুক্তি, হজরত ঈসা (আ.)-এর আসমানে জীবিত অবস্থায় উঠে যাওয়াসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনায় মহররম মাসের ১০ তারিখ অবিস্মরণীয় ও মহিমান্বিত। পৃথিবীর মহাপ্রলয় বা কিয়ামত মহররমের ১০ তারিখে ঘটবে বলেও ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় যথাযোগ্য মর্যাদায় এই দিনটি পালন করে থাকে। শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের মহান আদর্শকে সমুন্নত রাখতে তাদের এই আত্মত্যাগ মানবতার ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

কারবালার এই শোকাবহ ঘটনা ও পবিত্র আশুরার শাশ্বত বাণী সকলকে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং সত্য ও সুন্দরের পথে চলতে প্রেরণা যোগায় যুগ যুগ ধরে।

লেখক: সাংবাদিক।
ই-মেইল: [email protected]