Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

দেবীদুর্গা দুর্গতিনাশিনী

আহমাদ কামাল :
ষষ্ঠী তিথিতে বেলতলায় দেবীর ঘুম ভাঙানোর বন্দনায় শুরু হল বাঙালি সনাতন ধর্মবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা। আনন্দময়ী দেবী দুর্গার আগমনী গানে এখন চারদিক মুখরিত। মহাষষ্ঠীতে বোধনের মধ্য দিয়ে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে।  মহাশক্তি মহামায়া দুর্গতিনাশিনী দুর্গা এবার স্বামীর গৃহ কৈলাস থেকে বাবার বাড়ি বসুন্ধরায় আসছেন।

দুর্গা পৌরাণিক দেবতা। তিনি আদ্যাশক্তি, মহামায়া, শিবানী, ভবানী, দশভুজা, সিংহবাহনা ইত্যাদি নামে অভিহিত হন। দুর্গ বা দুর্গম নামক দৈত্যকে বধ করেন বলে তাঁর নাম হয় দুর্গা। জীবের দুর্গতি নাশ করেন বলেও তাঁকে দুর্গা বলা হয়।

ব্রহ্মার বরে পুরুষের অবধ্য মহিষাসুর নামে এক দানব স্বর্গরাজ্য দখল করলে রাজ্যহারা দেবতারা বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। বিষ্ণুর নির্দেশে সকল দেবতার তেজঃপুঞ্জ থেকে যে দেবীর জন্ম হয় তিনিই দুর্গা। দেবতাদের শক্তিতে শক্তিময়ী এবং বিভিন্ন অস্ত্রে সজ্জিতা হয়ে এ দেবী যুদ্ধে মহিষাসুরকে বধ করেন। তাই দেবীর এক নাম হয় মহিষমর্দিনী। কালীবিলাসতন্ত্র, কালিকাপুরাণ, দেবীভাগবত, মহাভাগবত, দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী, দুর্গোৎসববিবেক, দুর্গোৎসবতত্ত্ব  প্রভৃতি গ্রন্থে দেবী দুর্গা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা আছে।

দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হল হিন্দু দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত একটি উৎসব। দুর্গাপূজা সমগ্র হিন্দুসমাজেই প্রচলিত। তবে বাঙালি হিন্দু সমাজে এটি অন্যতম বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। আশ্বিন বা চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজা করা হয়। আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপূজা এবং চৈত্র মাসের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। শারদীয়া দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বেশি। বাসন্তী দুর্গাপূজা মূলত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

বঙ্গদেশে প্রথম দুর্গাপূজার প্রচলন করেন সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৫) রাজত্বকালে রাজশাহী জেলার তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণ। বাংলায় দুর্গাপূজা দশম অথবা একাদশ শতকেই প্রচলিত ছিল। হয়তো কংসনারায়ণ কিংবা কৃষ্ণচন্দ্রের সময় থেকে তা জাঁকজমকের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে থাকে। উনিশ শতকে কলকাতায় মহাসমারোহে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতো। অষ্টাদশ শতকের শেষ  অব্দি ইউরোপীয়ানরাও দুর্গোৎসবে অংশগ্রহণ করত।

দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। তবে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের অবাঙালিরাও ভিন্ন ভিন্ন নামে এ উৎসব পালন করে। যেমন কাশ্মীর ও দাক্ষিণাত্যে অম্বা ও অম্বিকা, গুজরাটে হিঙ্গুলা ও রুদ্রাণী, কান্যকুব্জে কল্যাণী, মিথিলায় উমা এবং কুমারিকা প্রদেশে কন্যাকুমারী নামে দেবীর পূজা ও উৎসব পালিত হয়। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে “দুর্গাষষ্ঠী”, “মহাসপ্তমী”, “মহাষ্টমী”, “মহানবমী” ও “বিজয়াদশমী” নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় “দেবীপক্ষ”। দেবীপক্ষের সূচনার অমাবস্যাটির নাম মহালয়া; এই দিন হিন্দুরা তর্পণ করে তাঁদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন করে। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। কোথাও কোথাও পনেরো দিন ধরে দুর্গাপূজা পালিত হয়। সেক্ষেত্রে মহালয়ার আগের নবমী তিথিতে পূজা শুরু হয়। সমাজে অন্যায়, অবিচার, অশুভ ও অসুর শক্তি দমনের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ পূজা হয়ে থাকে।

দুর্গাপূজা কিংবা অন্যান্য পার্বণ বাংলার শাশ্বত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গভীর থেকে উৎসারিত। তাই ধর্মের গন্ডিতে কখনও আবদ্ধ থাকেনি উৎসব। ধর্ম সম্প্রদায়ের, কিন্তু উৎসব সার্বজনীন হাজার বছর ধরে। সব ধর্মের মূলবাণী মানবকল্যাণ। দুর্গোৎসব সত্য-সুন্দর আর মঙ্গলালোকে উদ্ভাসিত হোক, দূরীভূত হোক সকল অশুভ আর পঙ্কিলতা। ঐক্য, পরমতসহিষ্ণুতা আর ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এ দেশের মানুষের অনন্য বৈশিষ্ট্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই ঐতিহ্যকে অক্ষুন্ন রেখে জাতীয় উন্নয়নে সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখতে হবে। শারদীয় দুর্গোৎসব সবার মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যরে বন্ধনকে আরও সুসংহত করুক, কল্যাণময় হোক জগৎবাসীর। “দুর্গাপূজা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসবই নয়, এটি আজ সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও সুন্দরের আরাধনা শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বাংলাদেশ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের নিরাপদ আবাসভূমি। আমাদের সবারই প্রত্যাশা, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার”- এ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে আমরা সবাই একসাথে উৎসব পালন করব। বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রেখে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলবো।  গত ৩০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার মহালয়ার মধ্য দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল দেবীপক্ষকে। ১১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মাধ্যমে সমাপ্ত হবে এই মহাউৎসবের। ইতোমধ্যে সারাদেশের সকল পূজামণ্ডপের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে, মঙ্গলবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসবের। একটি বছরের জন্য ‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবী ফিরে যাবেন কৈলাসে দেবালয়ে।  জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যলোকে আসেন। আর দেবী স্বর্গালোকে বিদায়ও নেবেন ঘোড়ায় চড়ে।

লেখক: সাংবাদিক।
e-mail, [email protected]