Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

মুগ্ধকে মুগ্ধ করেছেন যিনি, দগ্ধও হয়েছেন তিনিই!!!

আহমেদ কামাল:
বঙ্গ দেশিয় বাঙ্গালী জাতির অধিকাংশ বাবা-মায়ের মতো অপত্য অন্ধ সন্তান স্নেহ বিশ্বের আর কোনো জাতির মাঝে আছে কী না তা বিজ্ঞজনদের মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। স্বভাবতই ঐ মিলিয়ন ডলার প্রশ্নের উত্তর নিধিরাম সর্দারের না জানাই স্বাভাবিক। কারণ, সর্দারজী নিজে অত বিজ্ঞতো ননই, আবার একেবারেই যে অজ্ঞ তেমনও না।

পৃথিবীর তাবত প্রাণীকুলের মধ্যে মানুষই একমাত্র প্রাণী যাদের ‘মানুষ’ হয়ে উঠতে হয়। একটা গরু বা ছাগলের বাচ্চাকে হাতে কলমে কিছু শেখাতে হয় না। তাদের পারিপার্শ্বিকতা-সমাজ-পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারার যোগ্যতা না থাকলেও চলে। কিন্তু একটি মানব সন্তানকে জন্মের পর থেকেই একটা নির্দিষ্ট ধারা মেনে ‘মানুষ’ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। একটা ৮ মাসের শিশু আগুন বা পানির মধ্যে প্রভেদ করতে পারে না। সে আগুন ধরতে চায়-পানিতে নামতে চায় কেবল নিজ কৌতুহলের বশে। তাকে সেই মানুষ হবার প্রক্রিয়ায় ভাল-মন্দ-শিক্ষা-সংস্কার শেখানো হয়। পরিবার ও সমাজ থেকেও সে অনেকটা শেখে। বাবা-মায়ের সহচর্য, পরিবারের মধ্যে আত্মীকতার বন্ধনটা কেউ যদি ছোটবেলায় রপ্ত করে ফেলতে পারে, তাহলে হলপ করে বলা যাবে যে ঐ সন্তান কখনই অন্ধকারে পথভ্রষ্ট হবে না সঠিক পথের। এখানে মূখ্য ভূমিকাটা অবশ্যই বাবা-মায়ের।

মানুষের মধ্যে মানবতা ও সহমর্মিতা তৈরি হয় পরিবার থেকে। একটা শিশু প্রথম শিক্ষা নেয় পরিবার তথা মা-বাবার কাছ থেকে। তারপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিশু সময়ে যে শিক্ষা গ্রহণ করে, সেভাবেই মানুষ পরিচালিত হয়। শিশু সময়ের কোনো ভুল শিক্ষা জীবনকে বিপথগামী করতে পারে।

মা-বাবা মানবিক হলে সন্তানও মানবিক হবে। সব ক্ষেত্রে এটাই যে ধ্রুব সত্য, তা নয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মা-বাবার মানবিক গুণাবলিতে সন্তান প্রভাবিত হয়। অন্যকে সহযোগিতা করা, অন্যের প্রতি সদয় হওয়া ও সহমর্মিতা দেখানোর যে শিক্ষা, তা মা-বাবাকেই দিতে হয়। আমি যদি আমার মা-বাবাকে সম্মান না করি, তাঁদের অবজ্ঞা-অবহেলা করি, তাঁদের প্রতি সদয় না হই, তাহলে আমার সন্তানও আমার সঙ্গে তেমন আচরণই করবে। আমি নির্দয় হলে আমার প্রতিও আমার সন্তান নির্দয় হবে এটাই প্রকৃতির বিধান।

যে সন্তানের জন্য আমরা দশ দুয়ারী ভিখেরির মতো কুড়িয়ে কুড়িয়ে ভালোবাসা আর স্বচ্ছলতা জমিয়ে রেখেছিলাম, সেই স্বচ্ছলতার ছুরি আর আগুন কেন আমাদের রক্তাক্ত করে, পোড়ায় ?   আর কি কারণে ওরা এমন মৃত্যু হাতে করে ছুটে আসে আমার দিকে, আমাদের দিকে ?  তবে কী  জীবন যাপনের হিসেবে কোথাও ভুল ছিল ?

ভুল তো হয়েইছিল। আমরা সন্তান জন্ম দিয়েই ভেবেছিলাম “মা-বাবা” হয়ে গেছি। কিন্তু এই ‘মা-বাবা’ হওয়াটাই ছিল মস্ত বড় শুভঙ্করের ফাঁকি।

মাতৃত্ব ও পিতৃত্ব ! তার যে অনেক দায়! মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের মানে- প্রাণের সাথে প্রাণের প্রেম, প্রাণ থেকে প্রাণের শুরুৃএ এক অপার্থিব জীবন আবেদন। এই জীবন আবেদনে সন্তানের প্রাণের সাথে আমাদের প্রাণ যোগাযোগ করতে না পারলে কিসের মা-বাবা হওয়া!

সন্তানের ভাষা বুঝতে না পারলে, সন্তানের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারলে, সন্তানের  জন্য কোনও আদর্শ তৈরি করতে না পারলে আমার সন্তান ‘বখে’ গেছে বলে বিলাপ করার কী  মানে ? সন্তানের হাতে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কিনে এনে দিয়ে, দিনে আটশ টাকা হাত খরচ দিয়ে, কোন মাতৃত্বের ও পিতৃত্বের বড়াই করি আমি আপনি এবং আমরা ? আমার বুকের ওম না পেয়ে ছেলে কোন সময় নেশার ওমে বুঁদ হয়েছে তা আমি জানতেও পারিনি! যখন জানলাম তখন আমারই সন্তান আমারই জন্য লুকিয়ে মৃত্যু পরওয়ানা এনেছে  ভালোবাসার কফিনে। হায় জীবন !! হায় নিয়তি !!!

সন্তান জন্ম দেয়া যতটা সহজ তাকে সুসন্তান হিসাবে গড়ে তোলা ততটা সহজ নয়। আবেগের আতিশয্যে সন্তানের সকল আবদারে সায় দিলে মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গলই বেশী ঘটে। আমরা যতই সম্পদশালী হই না কেন- সন্তানকে এটা বুঝতে দিতে হবে যে, চাইলেই সব পাওয়া যায় না। আর বয়সের সাথে চাওয়ার একটা সীমা পরিসীমার রেখা নিহিত আছে। নিজেকে চাহিত বস্তুর উপযুক্ত করে গড় তুলতে না পারলে আকাক্সিক্ষত সব বস্তু পাওয়া যাবে না।

কিছু কিছু বাবা-মা সুস্থ সন্তান জন্ম দেন ৯/১০ মাসে আর বাকি জীবন সেই সন্তানকে পঙ্গু করে গড়ে তোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সন্তানদের হাতে অতিরিক্ত টাকা দেয়ার কূফলে আগুনে পুড়ে যাওয়া হয়তো একটি এক্সট্রিম ঘটনা, কিন্তু নজর বুলিয়ে দেখা যায় আপনার আমার আশেপাশে ছোটখাটো  ঘটনা একেবারে যে খুব কম তা কিন্ত্তু নয়। তাহলে আমরা কি আমাদের সন্তানদেরকে স্বনির্ভর করে বড় করে তুলতে পারছি ? অবশ্যই না।

ইদানিং সন্তান খুন করছে তার পিতা-মাতাকে পত্রিকায় এরকম সংবাদ শিরোনাম পড়তে পড়তে স্থবিরতা বা মানসিক অসাড়তা আজ আর তেমন ভাবে কাজ করে না। অভ্যস্ততা বড়ই বাজে জিনিস।

নতুন মডেলের মোটরসাইকেল কিনে না দেওয়ায় ফারদিন হুদা মুগ্ধ নামের এক বখাটে ছেলে তার বাবা-মাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করেছে! মাত্র এসএসসি পাশ করা এই ছেলেকে কিছুদিন আগেই তার বাবা ৫ লক্ষাধিক টাকা দিয়ে ছেলের আকাঙ্খিত একটি মোটরসাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। আবার এখন ছেলের খায়েশ হয়েছে নতুন মডেলের মোটরসাইকেল কিনতে, কিন্ত্তু সেটা না পেয়ে বাবা-মায়ের শরীরে পেট্রোল ঢেঁলে পুড়িয়ে দিয়েছে! অবশেষে মুগ্ধের বাবা হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দিন কয়েক মৃত্যুর সাথে পান্জা লড়ে অন্ধকার কবরে ঠাই পেয়েছেন।

ঢাকার একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর মা ছিলেন খ্যাতনামা চিকিৎসক, নিজের মাথা চাপড়ে বলেছিলেন যে, এসএসসি পাশ করার পরে ছেলেকে মোটরসাইকেল কিনে দেয়াটা ছিল তার জীবনের সবচাইতে বড় ভুল।

এইতো কয়েক বছর আগে মোহাম্মদপুরের এক লোক কয়েকটি পত্রিকার পাতায় আহাজারি করে বলেছিলেন, অষ্টম শ্রেনীতে উঠার পরে সন্তানকে ‘ভিডিও গেম’ খেলার জন্য প্রতিদিন ৮শ করে টাকা দিতেন। অতঃপর সেই সন্তান ভয়াবহ মাদকাসক্ত হয়ে এরকম খুনের ঘটনাই ঘটিয়েছিল। এখন যদি অষ্টম শ্রেনীতে পড়ুয়া সন্তান দিনে ৮শ টাকা পায়, তাহলে তার কৃতকর্মের জন্য কি সেই সন্তানের জেল হওয়া উচিত নাকি বাবা-মায়ের ? মিলিয়ন ডলারের কোশ্চেনের উত্তর ??  সর্দারজী নিশ্চুপ!

উলঙ্গ অর্থনীতিতে এরকমই তো হবার কথা। আমরা আমাদের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত সব বিক্রি করে দিয়ে উন্নয়ন কিনে চলেছি। এই উন্নয়নকে ‘পরিবর্তন’ নামের মোড়ক দিয়ে ঢেকে  সর্বগ্রাসী করার চেষ্টা চলছে সর্বত্র। পরিবর্তন তো সবাই চায়। পরিবর্তন মানে বদল। কিন্তু উন্নয়নের এই বদলের স্বরূপ অনেকটা মুগ্ধের মোটরসাইকেল বদলের মতোই।

আমরা মোটরসাইকেল বদলাই, ডাইনিং টেবিলের হাল বদলাই, ড্রইংরুমের চেহারা বদলাই, টয়লেটের বদনা বদলাই, রংতুলিতে নিজমুখের রূপ বদলাই- আমরা বদলাতে আর বদলাতেই থাকি। পুরো সমাজটাকে বদলে দেবার কি অসাধারণ বিপ্লবী একটা কায়দা এই উন্নয়ন। উন্নত হতে হতে আমরা শুধু নিরীহ অপিরিচিত মান্ষুকে খুন করেই ক্ষান্ত হইনা, একসময় নিজের মা-বাবাকেও হত্যা করতে অগ্রসর হই। হায় উন্নয়ন!

উন্নয়নের আফিম-গাঁজা আর ইয়াবা দিয়ে যখন মানব মগজে ঘুন ধরিয়ে ধীরে ধীরে তরুণ-যুব মানুষকে ধ্বংস করা হচ্ছে, তখন মানুষ সকল বন্ধন ছিন্ন করে এরকম সর্বগ্রাসী রাক্ষস হয়ে উঠবেই- সেই সর্বনাশের জাল পেতে রাখা হয়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এই জাল ছিন্ন করতে না পারলে দেখা যাবে- কোন একদিন আমার আপনার প্রাণাধিক সন্তান আমাকে আপনাকে মেরে ফেলতে চাইছে, অথবা আমি আপনি নিজেই আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছি। আর তা হতে পারে শুধুমাত্র একটি ফরেন ব্রান্ডেড গিটারের আবদার আমি আপনি মেটাতে পারিনি বলে। অতএব, সময় থাকতে উন্নয়নের এই গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে সর্বজনের কথা ভাবতে হবে আমাকে-আপনাকে তথা সবাইকে।

বিদেশীরা নিজেদের সন্তান-সন্ততিকে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলতে সর্বদা স্বচেষ্ট এবং সফল। অপরদিকে আমরা বঙ্গ দেশিয় বাঙ্গালী জাতির কিছু কিছু বাবা-মা আমাদের সন্তান-সন্ততিকে তাদের নিজেদের বিছানাটা সুন্দর করে গুছিয়ে পরিপাটি করে রাখতে শেখাই না। ৮ বছরের বাচ্চা কিন্তু দিব্যি নিজের বিছানা ঠিক করতে পারে, নিজের বই গুছিয়ে রাখতে পারে এমনকি খাবার পরে অন্তত নিজের এঁটো প্লেটটি রান্নাঘরের সিঙ্কে নিয়ে রেখে আসতে পারে। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাসার বাইরে নানা ঝুঁকি আছে বলে সন্তানকে ঘরে আগলে রাখি আমরা, সে ভালো কথা-কিন্তু ঘরের ভেতরে সন্তানকে তো অন্তত স্বনির্ভরতা কিছুটা শেখানো উচিত। কিছু কিছু বাবা-মায়েরা এটা না করে বাসার কাজের বুয়ার উপর নির্ভরশীল। এতে খুব সহজেই  উনাদের জাতও বাঁচে, সমাজে অভিজাতের তকমাটাও জুঁৎসই হয়ে লাগে।

নিজের সন্তান-সন্ততিকে প্রকৃত মানুষ করতে চাইলে শুরু থেকেই এই শিক্ষা দেয়া উচিত যে, জীবন খুবই কঠিন। এখানে ইচ্ছেমত চাইলেই সবকিছু পাওয়া যায় না, অর্জন করে নিতে হয়। সন্তানেরা চাইলেই সব খেলনা কিনতে পারবে না, সেটার একটা রুটিন থাকা দরকার। আমার যতই টাকা পয়সা থাকুক সেটি আমার, আমার সন্তানের জন্য সেটি অফুরন্ত করে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। মনে রাখতে হবে যে, প্রয়োজন আর বিলাসিতা এক জিনিস নয়। দশম শ্রেণির সন্তান একটা বাইসাইকেল পেতে পারে অবশ্যই, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই পাঁচ লক্ষাধিক টাকার মোটরবাইক নয়। স্কুল পড়ুয়া একটা সন্তানের নিরাপত্তার জন্য যদি মোবাইল ফোন কিনে দিতেই হয়, সেটিও হওয়া উচিত একেবারেই সস্তা দামের সেট, শুধু ফোন আর টেক্সট মেসেজ করা যায় এমন ‘আনস্মার্ট’ ফোন। সেই ফোনও বাসায় বাবা-মার জিম্মায় থাকা দরকার।

সন্তান-সন্ততি নিজেরা বাবা-মা হওয়ার আগে বুঝতেই পারবে না বাবা-মা কতটা কষ্ট করেন এজন্যেই যে তার সন্তান যেন ভাল খেতে পারে, পরতে পারে। তাদের টুকটাক ইচ্ছে যেন পূর্ণ হয়। এতে কেউ বিগড়ে যায় বলে মনে হয় না সর্দারজীর। বিগড়ে দেয় পরিবেশ, আশেপাশের সঙ্গ ইত্যাদি। শুধু কি বাইক বা গিটার অথবা ভিডিও গেম ? প্রতি ঈদে বিদেশের অমুক কাপড় তমুক কাপড়ের জন্য আত্মহত্যা সংসারে অশান্তি এগুলোও তার কুফল ?

বিদেশের সাথে আমরা দেশের সন্তান-সন্ততিদের তুলনা করতে পারিনা, ওরা বিদেশীরা টিনএজেই কর্মসংস্থানের পথ বেছে নেয়। অপরদিকে আমাদের সন্তানেরা গ্রাজুয়েশন শেষ করেও বাবা-মায়ের প্রতি নির্ভরশীল থাকে।

সর্দারজী গভীরভাবে চিন্তিত এ কারণেই যে, অনেকেই আছেন যারা তাদের সন্তানদের ওপেন ইন্টারনেট অ্যাক্সেসই বলেন, অফুরন্ত অর্থের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া বলেন বা দামি খেলনা বা জামাকাপড় অথবা গাড়ি কিনে দেওয়াই বলেন সব কিছুই মোটামুটি নজরদারিতে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু আশপাশের বিলাসিতা, সন্তানদের বন্ধুদের চলন বলন থেকে তাদের সন্তানদের দূরে রাখতে পারেন না। সন্তানেরা স্কুলে গিয়ে দেখে আসে বা শুনে আসে সহপাঠী বন্ধুদের কি কি আছে, তাদের বাবা-মা তাদের কি কি দিচ্ছে, কত সুন্দর খেলনা, আর কি নাই! বাসায় এসে এই সন্তান গুলোই সচেতন বাবা-মা কে প্রশ্ন করা শুরু করে দেয়, নিজেদের কম্পেয়ার করে। তখন অনেকেই সন্তানদের জেদের সাথে পারেন না, আর যারা বুঝানোর চেষ্টা করেন তাদেরকে সন্তানেরা শত্রু ভাবা শুরু করে। এসব ক্ষেত্রে এই ব্যাপার গুলো সামলানো খুবই কঠিন হয়ে ওঠে। আর তখনই চোখের সামনে ধরা দেয় কঠিন বাস্তবতাৃ.যে সন্তানকে চোখের সামনে এইটুকু থেকে বড় হতে দেখলেন, সেই-ই যখন একদিন স্নেহ-মমতায় ঘেরা বোধের সীমানা ভেঙে দিয়ে বাইরে দাঁড়ায়ৃ.তখন এই পৃথিবী সত্যিকার অর্থেই রসশূন্য হয়ে যায়। সর্দারজীর মতে, “আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে ভাতে” এই মন মানসিকতা থেকে প্রত্যেক মা-বাবারই বের হয়ে আসা উচিত যত দ্রুততম সময়ে সম্ভব। এটা বর্তমান বাস্তবতার নিরীখে সময়ের চরম দাবি।

সর্দারজী উৎকন্ঠিত যে কারণে, আমাদের দেশের বর্তমান বাবা-মায়েদের কাছে সন্তান যেন ননীর পুতুল, আর তাই এসব ঘটছে অহরহ। ভবিষ্যতের একেকটা ঐশী-মুগ্ধ তৈরী করে এভাবেই গড়ে তুলছি আমরা ছোট্ট শিশু গুলোকে। মুগ্ধ একটা সতের বছরের ছেলে নেশা করছে, বখে যাচ্ছে টেরও পাননি বাবা-মা। কিন্তু চাওয়ার আগেই ছেলের সামনে হাজির করেছেন আলাদিনের চেরাগ। চেরাগ ঘষলে পাঁচ লাখ টাকার বাইক মিলে, বন্ধু মিলে। কিন্তু ‘বাবা-মা’ মিলে না, সোহাগ-শাসন  মিলে না।  চেরাগে নেশা মিলে, জীবন তো মিলে না। আহা, সেই জীবন পুড়িয়ে দাম শোধ করলেন পিতৃত্বের।

আসলে মা-বাবা সত্যিকার মানুষ গড়ার কারিগর না হয়ে টাকা রোজগারের মেশিন হওয়ায় এবং অশিক্ষিত কাজের বুয়ার হাতে সহজে সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব দেওয়ার ফলেই নৈতিক মুল্যবোধহীন প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। আর অতিরিক্ত চাহিদাই সুষ্ঠ মানুষকে নষ্ট করে। আমাদের মা-বাবার উচিত সন্তান কি করে না করে তার দিকে খেয়াল রাখা।

শুধু স্কুল আর কলেজে পাঠিয়ে দিলেই সন্তানের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আর এটাও বুঝা উচিত কোনটায় সন্তানের মঙ্গল আর কোনটায় সন্তানের অমঙ্গল হয়। মা বাবার উচিত সন্তানের সাথে বন্ধু সুলভ আচরন করা। তাহলে সন্তান ও অমূলক কিছু করতে হলে বুঝে শুনে নিজেকে আয়ত্ব করার চেষ্টা করবে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত সন্তানদের সবার আগে মানবতার শিক্ষা দেওয়া। তাদেরকে বেশি সময় দেওয়া, বেশি বেশি মেশা, গল্প করা, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া। তাদের সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মানসিকতা তৈরি করা। তা না হলে সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেও কোনো লাভ হবে না। সন্তান মানুষের মতো মানুষ হবে না। এটা সব সময় মনে রাখা দরকার। অন্তত নিজেদের একবার আয়নায় দেখি। সন্তানের হাতে জীবন দেয়ার পেছনে, কতটা আমাদের দায় আর কতটা নিয়তি সে হিসেবটা যেন এবার করি।

সর্দারজীর মতে, সন্তান স্নেহে অন্ধ হয়ে বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় ভূল সন্তানের অন্যায় আবদার পূরণ করা। আবার এর জন্য পরিবার যেমন দায়ী, তেমনি সমাজও। ছেলেকে পাঁচ লক্ষাধিক টাকার একটি মোটরসাইকেল কিনে দেন তারা। সেই মোটরসাইকেলটি পরিবর্তন করে নতুন মডেলের মোটরসাইকেলের দাবি তোলে মুগ্ধ!! মুগ্ধকে মুগ্ধ করেছেন যিনি, দগ্ধও হয়েছেন তিনিই!!! এগুলো সবই আমরা জানি। কিন্তু আমরা মানি কি??

যদি না মানি, তাহলে নিজের সন্তানকে পঙ্গু অথবা বখাটে বানানোর দায়ভার কি আমাদের  নিজেদের নয় ? নিজে দায়িত্বহীন আচরণ করে জাতির জন্য একটি অকাট আত্মবিশ্বাসহীন, অকর্মা নাগরিক তৈরি করাটা কি সুনাগরিকের পরিচয় বহন করে নাকি অন্য কিছুর অর্থ বহন করে?? সর্দারজী কিন্তু জানেন, এই মিলিয়ন ডলার প্রশ্নের ‘উত্তর’ অপেক্ষায় আছে নিকট আগামীর জন্যে।

লেখক : সাংবাদিক।
[email protected]