Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

গ্রাহকের অপেক্ষায় কমছে ফ্ল্যাট ও ব্যাংকগুলোর সুদের হার

নিউজ ডেস্ক: টানা মন্দার পর ফ্ল্যাটের দাম কমিয়ে আনছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। এই সুযোগ ধরতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও কমাচ্ছে সুদের হার। ফলে সুদের হার এখন এক অঙ্কের আশপাশে। সহজ করছে ঋণ নেয়ার প্রক্রিয়াও। প্রতিষ্ঠানগুলোই এখন ঋণ দিতে ছুটছে গ্রাহকদের দ্বারে দ্বারে, যাতে গৃহঋণকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

চাকরিজীবী যে কারও কাছে ফ্ল্যাটই প্রথম স্বপ্ন, এরপর অন্য কিছু—এমনটাই বলছিলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসির কনজ্যুমার বিভাগের মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ জাভেদ নূর। তিনি বলেন, ‘৪০-৫০ হাজার টাকা মাসিক বেতন হলেই মিরপুর বা মোহাম্মদপুরে একটি ফ্ল্যাট নেওয়া যায়। তবে সেটা ৯০০-১০০ বর্গফুটের মধ্যে হতে পারে। এমন গ্রাহকই আমরা খুঁজি, পাচ্ছিও তা-ই।’

জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ইসলামী, আইএফআইসি, ব্র্যাক, ইস্টার্নসহ কয়েকটি ব্যাংক ফ্ল্যাট কিনতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল হাউজিং ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ডেলটা ব্র্যাক হাউজিং ফিন্যান্স করপোরেশন (ডিবিএইচ), আইডিএলসি, আইপিডিসি, লংকাবাংলা ফিন্যান্স ফ্ল্যাট কিনতে ঋণ দিচ্ছে। এতে চাঙা হতে শুরু করেছে আবাসন খাত।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে গৃহায়ণ খাতে ঋণের সীমা গ্রাহকপ্রতি বাড়িয়ে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা করে। আগে যা ছিল ১ কোটি টাকা। এ ছাড়া ঋণ ও মূলধন অনুপাত ৭০: ৩০ করা হয়। অর্থাৎ ১ কোটি টাকার ফ্ল্যাটে ব্যাংক ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করতে পারবে। বাকি ৩০ লাখ টাকা জোগান দিতে হবে গ্রাহককে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্দেশনার পরই মূলত ব্যাংকগুলো হোম ঋণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। তবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এ নিয়ম প্রযোজ্য হচ্ছে না।

জানা গেছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল হাউজিং ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট আবাসন খাতের ঋণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। ঋণের সুদের হার ১০-১২ শতাংশ। নতুন করে চালু করতে যাচ্ছে গ্রুপ গৃহ ঋণ প্রকল্প। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কয়েকজনকে জমি কেনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি ৩০ শতাংশ এবং ফ্ল্যাট নির্মাণে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ-সুবিধা দেবে।

একইভাবে ডিবিএইচও আবাসন খাতে ঋণ প্রদানকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে গত জুন পর্যন্ত ডিবিএইচ বিতরণ করেছে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ। এতে আবাসন খাতে প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ হয়েছে ৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। বর্তমানে গ্রাহকসংখ্যা ১৬ হাজার। এর মধ্যে ৩৫ লাখ টাকা ঋণের চাহিদাই ছিল বেশি। তবে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ-সুবিধাও আছে। এ পর্যন্ত ৫০ হাজার গ্রাহককে ঋণ-সুবিধা দিয়েছে। সুদের হার ৯-১০ শতাংশ।

ডিবিএইচের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. শরিফুল আলা বলেন, ফ্ল্যাটের চাহিদা বাড়ছে, পাশাপাশি দামও সমন্বয় হচ্ছে। এ খাতে সুদের হারও কমে আসছে। আবাসন খাত পুরো মাত্রায় চাঙা হতে দু-তিন বছর লাগবে। তবে নিবন্ধন মাশুল প্রায় ১৫ শতাংশ হওয়ায় খাতটি থমকে আছে।

একইভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি গৃহঋণের সুদ নিচ্ছে সাড়ে ৯ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত। তবে ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা ঋণের গ্রাহকই বেশি। ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ-সুবিধাও আছে। প্রতি মাসে ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রাহককে ঋণসেবা দিচ্ছে। দিচ্ছে তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে ঋণ প্রাপ্তির সুবিধা। এখন পর্যন্ত এ খাতে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। আইডিএলসির কনজ্যুমার বিভাগের মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ জাভেদ নূর বলেন, বিভিন্ন দেশে বয়সের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের ফ্ল্যাট কেনার প্রচলন আছে। এটা সম্ভব হয়েছে ফ্ল্যাটের সেকেন্ডারি বাজার থাকার কারণে। এ ছাড়া ফ্ল্যাট নিবন্ধনের প্রক্রিয়াও সহজ। বাংলাদেশে এমন একটা পদ্ধতি চালু করা গেলে ফ্ল্যাটের বাজার বড় আকার ধারণ করবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গৃহঋণ খাতে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, আইএফআইসি ৭০০ কোটি টাকা, আইপিডিসি প্রায় ১৫০ কোটি টাকা, ইসলামী ব্যাংক প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। ঋণের সুদের হার ৯ থেকে ১২ শতাংশ।

ব্যাংকগুলো অনেক আগে থেকেই হোম ঋণ দিয়ে এলেও ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে আইএফআইসি ব্যাংক প্রথম কম সুদে হোম ঋণ নিয়ে প্রচারণায় আসে। ব্যাংকটি সে সময় ১১ দশমিক ৯৫ শতাংশ সুদে হোম ঋণ দেয়া শুরু করে। যে সময় অন্য ব্যাংকগুলোতে সুদের হার ছিল ১৫ শতাংশের বেশি। পরে একই বছরের আগস্টে ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে সুদের হার কমিয়ে ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ করে ব্যাংকটি। ঋণের সুবিধাভোগীদের মধ্যে বড় অংশই বাড়ির মালিক ও চাকরিজীবী। এ ছাড়া কিছু ব্যবসায়ীও ঋণ নিয়েছেন।

আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারওয়ার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সুদের হারের কারণে গ্রাহকেরা ফ্ল্যাট কেনার চিন্তাই করতেন না। ব্যাংক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব ছিল গ্রাহককে এ বিষয়ে সহায়তা করার। আকর্ষণীয় সুদের হার দিয়ে সেবা চালুর পরই আমরা ভালো সাড়া পাচ্ছি। ফলে খাতটি আবারও চাঙা হতে শুরু করেছে।’

জানা যায়, অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ টেকওভার করলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম সুদে ঋণ দিচ্ছে। এ ছাড়া বাড়তি ঋণের ক্ষেত্রেও একই সুদ। এতে কোনো প্রক্রিয়াগত মাশুলও নেই। নতুন ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার একটু বেশি হচ্ছে। তবে গ্রাহকভেদে কম সুদেও ঋণ মিলছে। নতুন ঋণে ছয় মাস অতিরিক্ত সময়ও মিলছে ঋণ পরিশোধে।

সম্প্রতি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় কথা হয় বেসরকারি কর্মকর্তা শফিকুল আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘চাকরির মাঝ সময়েই একটা ফ্ল্যাট কিনতে চাই। এ জন্য ব্যাংকঋণের খোঁজে এসেছি। বেশি সুদ হওয়ায় আগে ঋণ নেয়ার সাহস করিনি। এখন যেহেতু ফ্ল্যাটের দাম কম, সুদও কমেছে, তাই কিনে ফেলব। ব্যাংকও এখন ঋণ দিতে আগ্রহী।’