Templates by BIGtheme NET
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

“জিয়া ইতিহাসের এক অনিবার্য বাস্তবতা”

ডক্টর এম মুজিবুর রহমান:
শহীদ জিয়াউর রহমান অমর ও চিরঞ্জীব ।বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তম সেনানায়ক থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল -বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা তিনি।  যে দলটি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে বার বার রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে দেশ পরিচালনা করেছে। বিএনপি দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠির আশা আকাঙ্খার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। শহীদ জিয়ার নেতৃত্বের  স্ফুরণ ঘটেছিলো ১৯৭১ সালেই, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে। তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জিয়াউর রহমান একটি অনিবার্য নাম। জিয়াউর রহমান জনগণের শ্রদ্ধা ভালোবাসায় ধন্য এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি স্বাধীন রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ।  সেনাবাহিনীকে একটি সুশৃংখল ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলেছেন। একজন সামরিক কর্মকর্তা হয়েও সময়ের প্রয়োজনে রাজনীতিতে এসে বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলাদেশকে আলোর পথে এনেছেন। তাই আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি তিনি। বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হওয়ারও গৌরব অর্জন করেছেন শহীদ জিয়াউর রহমান।

স্বনির্ভর বাংলাদেশের রূপকার জিয়াউর রহমান। তলাবিহীন ঝুড়ি খ্যাত অর্থনীতি থেকে বিশ্বে একটি সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি সৃষ্টি করেছেন জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের এ যাবতকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তিনি। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি ভুমিকায়ই তাঁর সফলতা ছিলো ঈর্ষণীয়। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখায় জিয়াউর রহমানকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। দেশ, মাটি ও মানুষের জন্যে আমৃত্যু নিবেদিত প্রাণ এই ব্যক্তিত্বের পরিচিতি সর্বজনবিদিত। দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, অসাধারণ দেশপ্রেমিক, অসম সাহসী ও সহজ-সরল-সাবলীল ব্যক্তিত্বের প্রতীক হিসেবে জিয়াউর রহমান ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

দুই: বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবর্তক শহীদ জিয়াউর রহমান।

রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতিতে শহীদ জিয়া বাংলাদেশের জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের যাদুকরী দর্শন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন দেশের ধর্ম- বর্ণ-  গোত্র- নৃগোষ্ঠী তথা আপামর সকল মানুষকে অভিন্ন প্লাটফরমে এনে দাঁড় করিয়েছিল। আমাদের জাতীয় জীবনে আত্মপরিচয়ের  যে সংকট সৃষ্টি হয়েছিল- দেশটা কেন? কাদের জন্য? এদেশের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? গন্তব্য কী? স্বপ্ন কী? – এর সব কিছুর উত্তর ও সমাধান তিনি তাঁর রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মধ্যে সংস্থাপন করেন। ফলে বাংলাদেশ বিভেদ ও হানাহানির বাইরে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি তৈরির জন্য একটা সুনির্দিষ্ট পাটাতন লাভ করে। শহীদ জিয়ার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী দর্শনেই আমাদের জাতিসত্ত্বার সঠিক স্বরূপটি আবিস্কৃত হয়-যা আমাদের ভৌগলিক জাতিসত্ত্বার সুনির্দিষ্ট পরিচয় দান করে। বিশ্ব মানচিত্রে আমাদের আত্মপরিচয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। শহীদ জিয়ার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখারও সাহসী অঙ্গীকার।

শহীদ জিয়াউর রহমান বিএনপিকে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী’ দর্শনের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী’ দর্শনের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজের লেখায় বলেন, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূল বিষয়গুলো ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে, যা ছাড়া জাতীয়তাবাদী দর্শনের আন্দোলন এবং তার মূল লক্ষ্য অর্থাত্ শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার কাজ হয়ে পড়বে অসম্পূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর।

আমরা বলতে পারি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মোটামুটি সাতটি  মৌলিক বিবেচ্য বিষয় রয়েছে, যা হচ্ছে : (১) বাংলাদেশের ভূমি অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সীমানার মধ্যবর্তী আমাদের ভৌগলিক ও রাজনৈতিক এলাকা; (২) ধর্ম ও গোত্র নির্বিশেষে দেশের জনগণ; (৩) আমাদের ভাষা বাংলা ভাষা; (৪) আমাদের সংস্কৃতি- জনগণের আশা-আকাঙ্খা, উদ্দীপনা ও আন্তরিকভাবে ধারক ও বাহক সমাজের নিজস্ব দৃষ্টি ও সংস্কৃতি; (৫) দু’শ বছর উপনিবেশ থাকার প্রেক্ষাপটে বিশেষ অর্থনৈতিক বিবেচনার বৈপ্লবিক দিক; (৬) আমাদের ধর্ম- প্রতিটি নারী ও পুরুষের অবাধে তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় অনুশাসন ও রীতি-নীতি পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা; (৭) সর্বোপরি আমাদের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার যুদ্ধ; যার মধ্য দিয়ে আমাদের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শন বাস্তব ও চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে।

অপরদিকে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে শহীদ জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। যার মধ্যে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তির বিষয়টি প্রাধান্য পায়। এ কর্মসূচির মধ্যে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছিল জনগণের খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয় এবং স্বাস্থ্যখাতকে। তাঁর শাসনকালে তিনি গ্রামোন্নয়ন, সামরিক বাহিনীর উন্নয়নের উদ্যোগ নেন। এছাড়াও সংবাদপত্রের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন। গ্রামোন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি স্বেচ্ছাশ্রমে খাল কাটা কর্মসূচির উদ্যোগ নেন। অত্যন্ত স্বল্প সময়ে রাজনীতি, অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া ও নারী-শিশু সবকিছুতেই একটা বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন।

চার: শহীদ জিয়ার তেজোদীপ্ত উচ্চারণ-আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জাগরণের প্রেরণা ।

বাংলাদেশে জনগণের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরিক হওয়া আজ সময়ের দাবি । এই মহান রাষ্ট্রনায়কের ৩৫তম শাহাদাত বার্ষিকীতে আধিপত্যবাদের ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করে জনগণের ঘাড়ে চেপে বসা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে পরাভূত করতে ২৬ মার্চ ১৯৭১, জিয়াউর রহমানের ডায়েরি স্বাধীনতার স্মৃতি’র তেজোদীপ্ত উচ্চারণ ” বাংলাদেশের জনগণের অনিরুদ্ধ জাতীয় চেতনাই স্বাধীনতা যুদ্ধের চালিকা শক্তি। এর প্রচন্ড স্রোতের মুখে খড় কুটার মতো ভেসে যাবে দখলদাররা। ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে বৈদেশিক আধিপত্যের সব কুটিল ষড়যন্ত্র ” আজো যুগায় সাহস ও অসীম প্রেরণা।

বাংলাদেশ বিভাজনের রাজনীতির বিয়োগান্ত শিকার হয়েছেন যে কয়েকজন, শহীদ জিয়াউর রহমান তাদের একজন। শহীদ জিয়া সকল প্রয়াত ও জাতীয় নেতাদের সম্মান করতেন এবং তাঁদের সর্ম্পকে ইতিবাচক কথা বলতেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে কুন্ঠাবোধ করে। কারণ তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা না করে আত্মগ্লানিতে ভোগে।  আমরা বীরের সম্মান দিতে জানি না। কলকাতা ফোর্ট উইলিয়ামে বাংলাদেশের একজন মাত্র মুক্তিযোদ্ধার ছবি আছে, বুকের ওপর দু-হাত আড়াআড়ি করে দাঁড়ানো। তিনি মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক, আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম।

তাই শহীদ জিয়াউর রহমান শুধু একজন ব্যক্তির নাম নয়, জিয়াউর রহমান ইতিহাসের এক অনিবার্য বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ তার স্বকীয়তা হারায়। তাই জিয়াউর রহমান নামটি হলো বাংলাদেশিদের আত্মপরিচয় ও মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার প্রেরণা।

লেখক: লন্ডন প্রবাসী । কলাম লেখক, শিক্ষক ও গবেষক।
সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।